চাঁদ ও নক্ষত্র সৃষ্টির এক অলৌকিক রহস্য

 



চাঁদ ও নক্ষত্র সৃষ্টির এক অলৌকিক রহস্য


মোঃ রোমান হোসাইনঃ 

চাঁদ ও নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 

تَبَارَكَ الَّذِىْ فِى السَّمَاءِبُرُوْجًاوَّجَعَلَ فِيْهَا سِرَاجًاوَّقَمَرَامُّنِيْرًا

অর্থাৎ,সেই মহান মহিমাময় আল্লাহ,যিনি আকাশে কক্ষপথ সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে বড় বড় নক্ষত্র ও উজ্জ্বল চাঁদ সৃষ্টি করেছেন 

(সূরা ফুরকান আয়াতঃ৬১)

মহান আল্লাহ পাক রাতকে অবকাশ ও বিশ্রামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।বাতাসকে শীতল ও আরামদায়ক করেছেন।তিনি রাতকে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার করে সৃষ্টি করেননি।বরং তাতে শান্তিদায়ক, কোমল ও স্নিগ্ধ আলাের সমাবেশ ঘটিয়েছেন ।কারণ,মানুষকে অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়।আর নিচ্ছিদ্র অন্ধকার রাতে কাজ করা অসম্ভব।গ্রীষ্মকালে অত্যাধিক গরমের কারণে বা সময়ের অভাবে দিনের অনেক কাজই অসমাপ্ত থেকে যায়।অনেক ক্ষেত্রে সে কাজ রাতেই সমাপ্ত করতে হয়।এ সময় চাদের আলাে অতিশয় সহায়ক। মুসাফিররাও রাতের কোমলতা ও স্নিগ্ধতায় স্বাচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারে।অনেক সময় নক্ষত্র ভরা আকাশে(অর্থাৎ পূর্ণিমার)চাঁদের স্নিগ্ধ ও মিষ্টি আলাে মানুষের মনকে আনন্দে আপুত করে দেয়।

প্রতিটি মাসের কিছু কিছু রাতে আকাশে চাঁদ অনুপস্থিত থাকে।অন্ধকার আকাশে মিট মিট করে তারকা জ্বল জ্বল করে।তারকার হালকা স্নিগ্ধ আলাে কিছুটা হলেও চাদের অভাব পূরণ করে।পূর্ণিমা বা তার আগে ও পরের রাতগুলােতে এক ঝাঁক তারকার মাঝে আকাশে পরিপূর্ণ চাদ ভেসে উঠে।তখন সারা পৃথিবীতে আলাের বন্যা বয়ে যায়।সব কিছুকে স্বপ্নীল আবেশে ভরে তােলে।মানুষ সেই আলাের মাধুর্যতায় ও স্নিগ্ধতায় আত্মহারা হয়ে পড়ে।

মহান আল্লাহ পাকের এই অসম্ভব সৃষ্টি কুশলতার প্রতি লক্ষ্য করাে,তিনি রাতের নিচ্ছিদ্র অন্ধকারকে চাদ ও তারকার স্নিগ্ধ আলাে দ্বারা দূর করেন,যাতে মানুষ গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে দিশেহারা হয়ে না পড়ে।আলোেদান ছাড়াও চন্দ্র ও নক্ষত্রে নিহিত রয়েছে বহু নিগূঢ় রহস্য।মহান আল্লাহ পাকের সৃষ্টির নৈপুণ্য।চন্দ্র-নক্ষত্রের আবর্তন -বিবর্তন দ্বারা বছর ও মাসের হিসেবও নির্ণিত হয় এবং কৃষ্টি ও আচার অনুষ্ঠানের অনেক তাৎপর্য এর গতি - বিধির সঙ্গে সংশিষ্ট।জলে বা স্থলে ভ্রমণকারীদের জন্য চাদ ও নক্ষত্রের দিক নির্দেশনা বিরাট এক অবলম্বন।আধার রাতে গভীর অরণ্যে বা বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে কিংবা বিশাল সাগরের বুকে চাদ ও নক্ষত্র দ্বারা দিক নির্ণয় করা দিশেহারা পথিকের জন্য অতিশয় সহজসাধ্য।

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন

وَهُوَالَّذِىْ جَعَلَ لَكُمْ النُّجُوْمَ لِتَهْتَدُوْابِهَا فِىْ ظُلُمَاتِ الْبَرِّوَالْبَحْرِ

অর্থাৎ ,সেই আল্লাহ তারকাসমূহ সৃষ্টি করেছেন ,যেন অন্ধকার(রাতে)জলে-স্থলে তােমরা পথ-নির্দেশ লাভ করতে পারাে।(সূরা আনআম আয়াতঃ৯৭)

চাঁদের আবর্তন ও বিবর্তন ,উদয় ও অস্ত , হাস ও বৃদ্ধি এবং কোন কোন রাতে একেবারেই অনুদয় কিংবা গ্রহণ কবলিত হয়ে সৃষ্টির অন্তরালে চলে যাওয়া,এ সমস্তের মধ্যেই রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের অপার কুদরত ও সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য।মানুষের পক্ষে সেই নিগূঢ় রহস্যের জাল ভেদ করা শুধু কষ্টসাধ্যই নয় , অসম্ভবও বটে।

তাছাড়া চাঁদ আকাশের ভাসমান অপরাপর তারকাগুলাের সঙ্গে গতির সামঞ্জস্যতা বজায় রেখেই স্বীয় কক্ষপথ পরিভ্রমণ করে।স্থুল দৃষ্টিতেও যা স্পষ্ট প্রতীয়মান।চাদ যদি এরূপ সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিশীল না হয়ে ভিন্নতর হতাে , তাহলে এমন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সময়ের ভারসাম্যতা রক্ষা করে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় কক্ষপথের নির্দিষ্ট দূরত্ব পরিভ্রমণ করা তার পক্ষে সম্ভব হতাে না।

মহান আল্লাহ তায়ালা চাদকে অনেক উর্ধ্বে স্থাপন করেছেন,যাতে তার গতির ঝলক আমাদের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত না করে এবং ঝলসে না দেয়।যেমন- মহান আল্লাহ পাকের অপার সৃষ্টি বিদ্যুতের ঝলক আমাদের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে ঝলসে দেয়।আল্লাহ তায়ালা চাদের এসব নেতিবাচক বা ক্ষতিকর বিষয় হতে আমাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে হেফাজত করেছেন।অন্যথায় চাঁদ যদি আমাদের অতি নিকটে হতাে বা তার দ্রুতগতি আমাদের দৃষ্টির মধ্যে থাকতাে তাহলে হয়ত এমন সব বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতাে যা আমাদের কল্পনারও বাহিরে।এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা চাদকে এক বিশেষ ধারায় সৃষ্টি করেছেন এবং প্রয়ােজন অনুসারে দূরত্বে স্থাপন করেছেন।

আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র আছে যেগুলাে বছরের কোন কোন রাতে দেখা যায় আবার কোন কোন রাতে দেখা যায় না।যেমন- সুরাইয়া,জুয়া,শুয়া ইত্যাদি।যদি এসব নক্ষত্র সব সময় আকাশে দেখা যেত।তাহলে মানুষ এগুলাে দ্বারা বর্তমানে যে উপকার লাভ করছে তা থেকে বঞ্চিত হত।আর মহান আল্লাহ তায়ালা কিছু নক্ষত্রকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যা বছরের প্রতি রাতেই দেখা যায় ।যেমন- সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতসিতারা । এগুলাে বিভিন্নভাবে মানুষের উপকারে আসে।প্রতি রাতেই এই সাত - সিতারা আকাশে উদিত হয় । আধার রাতে ভ্রমণকারীরা এগুলাের মাধ্যমে বিশেষ সাহায্য লাভ করে থাকে।

আকাশে ভাসমান তারকাগুলাে যদি গতিশীল না হতাে,স্বীয় কক্ষপথ পরিভ্রমণ করতাে এবং একই স্থানে স্থির হয়ে থাকতাে, তাহলে এখন তাদের গতিশীলতা দ্বারা মানুষ যেসব কল্যাণ ও দিক - নির্দেশনা লাভ করছে সে সব থেকে মানুষ বঞ্চিত হতাে।যেমন-এখন অন্ধকার রাতে ভ্রমণকারীরা সফরের সময় বিভিন্ন মঞ্জিল অতিক্রম করতে এসব গতিশীল তারকাগুলাে হতে দিক নির্দেশনামূলক সাহায্য লাভ করে।এ ছাড়াও এসব গতিশীল নক্ষত্রগুলাের প্রতি ঋতুতে পরিক্রমার ফলে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত বিভিন্ন উপকার লাভ করে থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা তার অসীম কুদরত ও অপার মহিমায় আকাশকে সুদৃশ্য ও মজবুত করে সৃষ্টি করেছেন এবং যথােপযুক্ত স্থানে স্থাপন করেছেন ,যা হাজার হাজার বছরেও এতটুকু দুর্বল হয়নি বা ভেঙ্গে পড়েনি এবং তাতে কোন বিপর্যয়ও ঘটেনি । আকাশে যদি সামান্যতম বিশৃংখলা ঘটতাে বা ভারসাম্যে তারতম্য দেখা দিতাে তাহলে হয়ত পৃথিবীতে ভয়ানক বিপর্যয় দেখা দিত এবং এর অধিবাসীদের জীবন সংকটাপন্ন হতাে । আর সৃষ্টির স্থিতি ও গতিতে ব্যত্যয় ঘটতাে।কিন্তু এখানেই মহান স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য যে,তাঁর নিপূন সৃষ্টি-কুশলতায় এ বিশ্বজগত একই নিয়মে একই গতিতে পরিচালিত হয়ে চলেছে।