নারী পুরুষ সৃষ্টির কারণ

 


 

 

 

 

 

 

মোঃ রোমান হোসাইনঃ 

নারী পুরুষ সৃষ্টির রহস্য।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ سُلٰلَۃٍ مِّنۡ طِیۡنٍ ۚ 

অর্থাৎ,আমি মানুষকে মাটির সারাংশ হতে সৃষ্টি করেছি।(সূরা মােমিনঃ১২)

আল্লাহ তায়ালা যখন মানবজাতিকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠানাের ইচ্ছে করলেন তিনি তখন তার সৃষ্টির নিয়মতান্ত্রিকতা এরূপ করলেন যেন এক থেকে ক্রমান্বয়ে অসংখ্যের বংশধারা সৃষ্টি হয়।সুতরাং তিনি মানুষকে পুরুষ ও নারী এই দু’শ্রেণীতে সৃষ্টি করলেন এবং তাদের অন্তরে পরস্পরের জন্য পরস্পরের ভালবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিলেন।আর তাদের অন্তরে ভালবাসা ও কামনার এমন অদৃশ্য ও প্রজ্জলিত শিখা জ্বালিয়ে দিলেন যে তারা পরস্পরে এক দুর্নিবার আকর্ষণে প্রভাবিত হয়,পুলকিত ও বিমুগ্ধ হয়।তাদের অন্তরে আরাে সৃষ্টি করে দিলেন পারস্পরিক সমঝােতা,সহমর্মীতা ও সহনশীলতা,যাতে দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘ সময় একত্রে তারা বসবাস করতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা পুরুষের দেহে একটি বিশেষ অঙ্গ সৃষ্টি করেছেন,যার মাধ্যমে।নারীর গর্ভে বীর্য সঞ্চার হয়।এই বীর্য সেখানে ক্রমান্বয়ে একটি পূর্ণ মানব দেহে রুপান্তরিত হয়। অবশ্য এই পরিপূর্ণ দেহ গঠিত হতে কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়।প্রথম পর্যায়ে বীর্য থেকে রক্তের সৃষ্টি হয় ,অতঃপর জমাট রক্ত থেকে মাংসপিণ্ড ,তারপর সৃষ্টি হয় অস্তি এবং এর উপরে আসে মাংসের আবরণ।অতঃপর তাকে শিরা-উপশিরার জাল দ্বারা পরিবেষ্টিত করে একটি মানব দেহে রূপান্তরিত করা হয়।এরপর সেই দেহে চোখ,কান ও অন্যান্য অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে।অতঃপর এতে শক্তির সঞ্চার হয় বা রূহ ’দান করা হয়ে থাকে।

চোখের দৃষ্টিশক্তির প্রতি লক্ষ্য করােঃ

এটা আল্লাহ তায়ালার এমন এক অমূল্য নিয়ামত ও বিস্ময়কর সৃষ্টি যার বিবরণ দেয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব।এই স্পর্শকাতর মূল্যবান অঙ্গটি সাতটি স্তরে গঠিত এবং এর প্রতিটি স্তরের আকার উপাদান যেমন ভিন্ন ভিন্ন,তেমনি এগুলাের কাজও বিভিন্ন।এর একটি স্তরও যদি নষ্ট বা অকেজো হয়ে যায় তাহলে চোখের দৃষ্টিশক্তিই হ্রাস পাবে বা দূর্বল হয়ে যাবে।

এবার চোখের পাপড়ি ও তাতে বিদ্যমান সূক্ষ পালকগুলাের প্রতি লক্ষ্য করােঃ

চোখের মত স্পর্শকাতর অঙ্গের হেফাজতের জন্য এগুলাে একান্ত প্রয়ােজনীয়।এগুলােকে আল্লাহ তায়ালা সক্রিয়তা ও দ্রুত উঠানামার শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন,যেন এগুলাে বাতাসে উড়ন্ত ধূলা-বালি ও ময়লা থেকে চোখকে রক্ষা করতে পারে।চোখের উপর কোন ধূলাকনা পড়ার উপক্রম হলেই পাপড়িগুলাে তা প্রতিরােধ করে এবং চোখকে সেগুলাের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করে।

আল্লাহ পাক চোখের পলককে এমন এক বিশেষ ক্ষমতা ও ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছেন যে প্রয়ােজনে তা সক্রিয় হয়ে উঠে,প্রয়ােজনে বন্ধ হয়ে যায় আবার খুলে যায় এবং চোখকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা হতে রক্ষা করে।চোখকে নানা বিপর্যয় থেকে রক্ষা কারা ছাড়াও পলক চোখের ও চেহারার শ্রী বৃদ্ধি করে।শোভা বৃদ্ধির জন্যই চোখের পাপড়িগুলােকে পরিমাণানুযায়ী লম্বা করে সৃষ্টি করা হয়েছে।যদি এর চেয়ে বেশী লম্বা করা হতাে ,তাহলে চোখের জন্য তা হতাে যন্ত্রণাদায়ক।আবার বেশী খাটো হলেও সমস্যা দেখা দিতে।কেননা এগুলাে ধুলা - কনা থেকে চোখকে রক্ষা করে।

আল্লাহ তায়ালা চোখের পানিকে লবনাক্ত করে সৃষ্টি করেছেন,যেন চোখে যেসব ধুলা-বালি ও ময়লা পড়ে তা পরিষ্কার হয়ে যায়।প্রলকের উভয় দিক কিছুটা নিচের দিকে ঝুকানাে , যেন চোখের পানি চোখের কোণ দিয়ে গাড়িয়ে পড়তে পারে।

ভ্রগুলাের সৌন্দর্যের দিকে লক্ষ্য করােঃ ধনুকের ন্যায় ঈষৎ বাঁকানাে ঝালরের ন্যায় সুসজ্জিত ভ্রুদ্বয় যেন ঠিক যথাস্থানেই স্থাপন করা হয়েছে।এগুলাে যেমন এক দিকে চেহারার শােভা বৃদ্ধি করে তেমনি চোখকে অনেক দিক থেকে হেফাজত করে।

মাথার চুল ও মুখের দাড়ি-গোঁফ এমন এক ব্যবস্থায় সৃষ্টি করা হয়েছে যে,তা নির্দিষ্ট সময়ে ও নিয়মে বৃদ্ধি পায়।মানুষ তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছেটে মাথা ও চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে পারে।যদি মাথায় চুল ও মুখে দাড়ি -গোঁফ না গজাতাে ,তাহলে পুরুষকে যেমন পৌরুষহীন দেখাতাে তেমনি বিদঘুটেও লাগতাে।

মুখ ও জিহ্বা আল্লাহ পাকের নিপূণ সৃষ্টি কুশলতারই দু'টি প্রকৃষ্ট নিদর্শন।ওষ্ঠদ্বয় যেন মুখেরই দু'টি কপাট।প্রয়ােজনের সময় তা তৎক্ষণাৎ খােলা যায় আবার সাথে সাথে বন্ধও করা যায়।এতে মুখের মধ্যে ক্ষতিকর ও অবাঞ্চিত কোন দ্রব্য প্রবেশ করতে পারে না।কথা বলার সময় ওষ্ঠদ্বয়ের বিশেষ প্রয়ােজন হয়।ওষ্ঠ সঞ্চালনে বর্ণ উচ্চারিত হয় এবং বর্ণের সাহায্যে শব্দের সৃষ্টি হয়।এ শব্দ দ্বারা মানুষ কথা বলে ,মনের ভাবের আদান - প্রদান করে।যদি ওষ্ঠদ্বয় না থাকতাে । তাহলে মুখ সর্বদা হা হয়ে থাকতাে।এতে অনেক ক্ষতিকর দ্রব্য মুখে প্রবেশ করে পেট চলে যেতাে এবং আরাে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতাে।তাছাড়া ওষ্ঠহীন মুখ দেখতেও বিশ্রী ও বিদঘুটে লাগতাে।পানাহারের সময়ও ওষ্ঠদ্বয় থেকে বিশেষ সাহায্য পাওয়া যায়।মুখের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য নড়াচড়া ও আটকে রাখার ক্ষেত্রে ওষ্ঠ বিশেষ সাহায্য করে থাকে।মুখের অভ্যন্তরে দাঁত আল্লাহ পাকের একটি অপূর্ব নিয়ামত।দাঁতগুলাের গঠন ও সারিবদ্ধতা কি চমৎকার !পৃথক পৃথকভাবে দাঁতগুলাে যেন এক একটি মুক্তা - খণ্ড।দাঁতগুলাে যদি এরূপ খণ্ড খণ্ড না করে আস্ত এক খণ্ডে সৃষ্টি করা হতাে তবে এতে বহু সমস্যা দেখা দিত।

কেননা এখন যে অবস্থায় আছে ,তাতে অবহেলা বা অসুখে দু'একটি দাত নষ্ট হলেও বাকিগুলাে দিয়ে।কাজ করা যায়।নষ্ট দাত ফেলে দিলে বাকিগুলাে সবল থাকে।যদি দাঁতকে একটি অভিন্ন হাড়ে সৃষ্টি করা হতাে তাহলে তা সম্ভব হতাে না।কেননা ,কোন একটি দাত নষ্ট হতে শুরু করলে তাকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ত।

দাঁত যেমন মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তেমনি এর আরাে অনেক কাজও রয়েছে।দাত ছাড়া খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন হতাে।কোন শক্ত খাদ্যদ্রব্য আহার করা তাে সম্ভবই হতাে না।দাঁত ও মাড়িকে এমন শক্ত ও মজবুত করে তৈরী করা হয়েছে যে,যে কোন শক্তদ্রব্য সহজে চিবিয়ে খাওয়া যায়।এমনকি দাঁতের চিরুনিতে হাড়গুলােও বিচূর্ণ হয়ে যায়।মাড়ি যদি নরম হতাে তাহলে দাঁতগুলােও সুদৃঢ় হতাে না।এতে শক্ত কোন কিছু চিবিয়ে খেতে বিপত্তি দেখা দিত।খাদ্য উত্তমরূপে চিবিয়ে খাওয়া এজন্য প্রয়ােজন যে,খাদ্যদ্রব্য পেটে গিয়ে অতি সহজে হজম হয়ে শরীরে পুষ্টি যােগায়।এতে দেহে শক্তি সঞ্চার হয় এবং দেহ হয় সবল ও কর্মক্ষম।

দেহ -বিজ্ঞানীদের মতে,খাদ্য পরিপাকের কয়েকটি স্তর রয়েছে এবং এর প্রথম স্তর হচ্ছে মুখ ,একে প্রথম পরিপাকের স্থান বলে। মুখের অভ্যন্তরে শক্ত মাড়ির উপর সুদৃঢ় দু ' পাটি দাঁত রয়েছে।এগুলাের সাহায্যে খাদ্যদ্রব্য উত্তমরূপে চর্বিত হয়ে পাকস্থলিতে যায়।দাঁতগুলাে মােতির মালার ন্যায় পরস্পর সন্নিহিত এবং এগুলাের গােড়াও অত্যন্ত সুদৃঢ়।মুখের ভিতর দাঁতগুলাে দেখতেও অতিশয় সুন্দর।পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর দাঁতবিশিষ্ট মুখের হাসিও অতিশয় চমৎকার।

মুখের ভিতর আল্লাহ তায়ালা অতি প্রয়ােজনীয় এক ধরনের তরল লালা সৃষ্টি করেছেন।যা খাদ্যের সাথে মিশে হজম ক্রিয়ায় সহায়তা করে। আহারের সময় এই লালা প্রয়ােজন পরিমাণে নির্গত হয় এবং খাবারের পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।ইহা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও সুনিপুণ কৌশলের প্রকৃষ্ট উপমা।এরূপ যদি না হতাে এবং সর্বদা এই লালা নির্গত হতে থাকতাে তবে মুখ খােলাই সমস্যা হয়ে পড়তাে।আর কথা-বার্তা বলা তাে আরাে দুষ্কর হয়ে পড়তাে।কেননা মুখ খুললেই বা কথা বলতে গেলেই লালা গড়িয়ে পড়তে এবং বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হতাে।আল্লাহ পাক পরম অনুগ্রহে এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যে,এই লালা কেবলমাত্র খাদ্য চিবানাের সময় নির্গত হয় এবং পরে বন্ধ হয়ে যায়।অবশ্য অন্য সব সময় মুখে লালা সীমিত পরিমাণে বিদ্যামান থাকে,যাতে মুখ ও কণ্ঠনালী সিক্ত থাকে।অন্যথায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে যেত এবং কথা বলা অসম্ভব হয়ে পড়তাে।এমনকি কণ্ঠনালী শুকিয়ে শ্বাস গ্রহণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়তাে।যার ফলে অনিবার্যভাবে প্রাণনাশ ঘটতাে।

এবার মুখের অভ্যন্তরের আরেকটি অংশ জিহবার প্রতি লক্ষ্য করােঃ

আল্লাহ তাঁর অশেষ হেকমতে একে স্বাদ অস্বাদনের মতাে বিস্ময়কর গুণাগুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।মানুষ জিহ্বা দ্বারা খাদ্যদ্রব্যের গুণাগুণ ও স্বাদ নিরীক্ষণ করে এবং সহজে উপাদেয় ও সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণ এবং ক্ষতিকর ও বিস্বাদ খাদ্য বর্জন করতে পারে।জিহ্বার স্বাদের কারণেই খাদ্য গ্রহণ প্রাণীদের পক্ষে আনন্দের ও তৃপ্তিদায়ক।তাজা ,টাটকা,বাসি , ঠাণ্ডা,গরম খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি যাবতীয় গুণাগুণ জিহ্বা দ্বারা নিরুপণ করা সম্ভব হয়।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেনঃ

 اَلَمۡ نَجۡعَلۡ لَّہٗ عَیۡنَیۡنِ ۙ وَلِسَانًا وَّشَفَتَیۡنِ ۙ       

অর্থাৎ“ আমি কি তাকে চক্ষুদ্বয় দেইনি , জিহ্বা ও উষ্ঠদ্বয় দেইনি।”

(সূরা বালাদঃ৮-৯) 

আল্লাহ তায়ালা শ্রবণের জন্য মানুষকে দু'টি কান দিয়েছেন,শ্রবণশক্তিকে সংরক্ষণের জন্য কানের অভ্যন্তরে এক ধরনের তরল পদার্থ সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে।আর কীট - পতঙ্গ ইত্যাদি অনিষ্টকর প্রাণী যাতে কানে প্রবেশ করে বিপদ ঘটাতে না পারে এ ব্যাপারে সেই তরল পদার্থ সদা সতর্ক - স্বক্রিয়।উভয় কানের ছিদ্রের পাশে একটি করে ঝিনুকাকৃতির পাখা রয়েছে,যা শব্দকে সংযত ও পরিমিত হয়ে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।কানের পাখাকে আল্লাহ তায়ালা তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন,যাতে অনিষ্টকর কীট-পতঙ্গ বা কোন বস্তু কান। স্পর্শ করার সাথে সাথেই যেন সে তা অনুভব করতে পারে এবং যে কোন বিপদাপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে।কানের ছিদ্র অনেকটা ' ও ' তির্যকারের,যাতে শব্দ পরিমিত হয়ে ভিতরে প্রবেশ করে এবং কোন পােকা -মাকড়ও যেন সহসা কানে প্রবেশ করতে না পারে।তাছাড়া পেঁচানাে পথে যে কোন কিছুরই প্রবেশ বিঘ্নিত হয়।আর কোন কিছু প্রবেশ করলেও তা সহজে বের করা যায়।

নাকের প্রতি লক্ষ্য করােঃ

ইহাকে কেমন সুন্দরভাবে এবং সযত্নে চেহারার মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে।এতে যেমন আকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি এর সাহায্যে নানাবিধ প্রয়ােজনীয় কাজ নেয়া হয়।নাকের ছিদ্রদ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা অতি কৌশলে ঘ্রাণ গ্রহণের এক বিস্ময়কর অনুভূতিশক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন।এর সাহায্যে খাদ্যদ্রব্যসহ যাবতীয় বস্তুর ঘ্রাণ নিয়ে তার গুণাগুণ যাচাই করা যায়।এর সাহায্যে ফুল ও সুগন্ধীয় দ্রব্যের ঘ্রাণ নিয়ে হৃদয়কে আমােদিত করা যায় এবং নাক বন্ধ করে যাবতীয় দুর্ঘন্ধ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।নাকের সাহায্যে মানুষ বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণ করে।এতে দেহের অভ্যন্তরে উত্তাপ সঞ্চার হয় এবং প্রাণ সজীব ও সতেজ থাকে।এ ছাড়াও নাকের আরাে বহু কাজ রয়েছে।শব্দ বা স্বর সৃষ্টি ও উচ্চারণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নাকের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

কারাে নাকের ছিদ্র খুব ছােট, কারােটা খুব বড়,কারােটা দীর্ঘ আবার কারােটা খাটো।আকৃতির এরূপ বিভিন্নতার কারণেই কণ্ঠস্বরে তারতম্য দেখা যায়।একজনের স্বর অন্যজন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।যেমন একজনের আকৃতি অন্যজন থেকে ভিন্ন।চেহারা দেখেই যেমন একজনকে চেনা যায়,তেমনি কণ্ঠস্বর শুনেও একজনকে চেনা যায়।আকৃতি ও স্বরের এই বিভিন্নতা আল্লাহ পাক রােজে আযল থেকেই করে রেখেছেন।হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও হযরত হাওয়া আলাইহিস সালামের আকৃতিও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও সেই আকৃতির বিভিন্নতা চলে এসেছে।স্বর ও আকৃতির এই বিভিন্নতায় রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের সুনিপুণ সৃষ্টি কুশলতার নিদর্শন।এই বিভিন্নতা দিয়ে আল্লাহ পাক আমাদের উপর যথেষ্টই এহসান করেছেন।কেননা পৃথিবীতে সকল মানুষের চেহারা ও আকৃতি যদি দেখতে একই রকম হতাে তাহলে বহু সমস্যার সৃষ্টি হতাে।

এবার লক্ষ্য করােঃ আল্লাহ তায়ালা মানুষের শরীরের দু’পাশে দুটি হাত দিয়েছেন,এগুলাের প্রয়ােজনীয়তা বর্ণনা করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব।এ হাত দিয়ে মানুষ উপার্জন করে এবং শত্রুর আক্রমণ ও বিভিন্ন বিপর্যয় থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এর রয়েছে চওড়া পাঞ্জা,সারিবদ্ধ পাঁচটি আঙ্গুল।বৃদ্ধাঙ্গুলিকে কিছুটা দূরে রাখা হয়েছে।এতে সে অপরাপর আঙ্গুলের সাথে সংযােগ সৃষ্টি করে কাজ করতে সক্ষম হয়।

 হাতের গঠনের প্রতি লক্ষ্য করােঃ আল্লাহ তায়ালা একে কতাে সহজ সাবলীল ও সুবিধাজনক আকৃতিতে গঠন করেছেন। পৃথিবীর সকল পণ্ডিত যদি একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে তথাপি এর চেয়ে সুন্দর ও উত্তম আকৃতির একটি হাত গঠন করতে সক্ষম হবে না।হাতের এই সুন্দর গঠনের ফলেই মানুষ অতি সহসা কঠিন ও জটিল কাজগুলাে সমাপন করতে পারে।বিভিন্ন বস্তু ধারণ, উঠাতে নামাতে এবং আদান-প্রদান করতে পারে।হাতের তালু বিস্তার করলে তা দিয়ে একটি ছােট থালার কাজ করা যায়।অঞ্জলী বানিয়ে তালু দ্বারা পানি পান করা যায় এবং এর দ্বারা চামুচের কাজও চলে।আবার প্রয়ােজনে ঝড়া মােছার কাজও করা যায়। আবার এই হাতকেই মুষ্টিবদ্ধ করে শত্রুকে আঘাত করা যায় বা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। আঙ্গুলের মাথায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে নখ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।এগুলাে একদিকে যেমন আঙ্গুলগুলােক হেফাজত করে তেমনি তাদের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে।নখ থাকার কারণেই আঙ্গুল দ্বারা সহজে যে কোন বস্তু উঠানাে যায় বা ধরা যায় এবং মাটি থেকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু তুলে নেয়া যায় । নখ ছাড়া মাটি থেকে ক্ষুদ্র কিছু তােলা প্রায় অসম্ভব। নখ শরীরের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ এবং এটাকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবাঞ্চিত বলে পরিগণিত করা হয়।কিন্তু এর উপকারিতা ও কার্যকারিতা অনেক।শরীর যখন চুলকায় তখন নখের সাহায্যেই চুলকানী নিবারণ করা হয়।নখ যদি না থাকত তাহলে চুলকানীর সময় খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতাে ।

নখের প্রখর অনুভূতিদীপ্ত সক্রিয়তার প্রতি লক্ষ্য করােঃ নিদ্রায়,জাগরণে সর্বদা শরীরের যে কোন স্থানে চুলকানাের জন্য নখ আপনা থেকেই সেখানে পৌছে যায়।আল্লাহর অপার মহিমা যে,তিনি শরীরে নখের মত একটি ক্ষুদ্র অংশে কত প্রয়ােজনীয়তা নিহিত করে রেখেছেন । নখের প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য করােঃ

নখকে হাড়ের ন্যায় শক্তও করা হয়নি আবার গােশতের ন্যায় নরম করেও সৃষ্টি করা হয়নি। বরং একে প্রয়ােজনানুসারে শক্ত ও নরমের সংমিশ্রণে এক ভিন্ন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে।নখ সব সময় এক অবস্থায় থাকে না।সে বর্ধনশীল বেশী বড় হলে তাকে আবার অনায়াশেই কেটে ফেলে দেয়া যায় । এতে কোন প্রকার সমস্যাই হয়।

মানব দেহের নিম্নদেশে পাতা বিশিষ্ট দুটি পা সংযােগ করে দেয়া হয়েছে।এ পা এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে,প্রয়ােজন মত তা গুটিয়ে রাখা যায় এবং প্রসারিতও করা যায়।পায়ের উপর ভর করেই দাঁড়াতে হয়।পায়ের সাহায্যেই মানুষ চলাফেরা করে এবং পায়ের সাহায্যেই দৌড়ায়।পায়ের আঙ্গুলের মাথায়ও রয়েছে,যা আঙ্গুলগুলাের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং এগুলােকে রক্ষা করে।

শরীরের এসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গই নাপাক বীর্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।শরীরের অস্থিগুলােও সেই নাপাক বীর্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অস্থিগুলাে খুঁটি স্বরূপ।এর উপরই সমগ্র শরীর নির্ভরশীল।অস্থিগুলাের প্রকৃতি ও আকৃতির প্রতি লক্ষ্য কর।সারা দেহে কত ধরনের অস্থির সমাবেশ ঘটানাে হয়েছে।এর মধ্যে কোনটা বাঁকা ,কোনটা সােজা ,কোনটা লম্বা ,কোনটা খাটো ,আবার কোনটা নিরেট ফাকা ,কোনটা চেপটা, কোনটা গােলাকৃতির ,কোনটা হালকা, কোনটা ভারী ইত্যাদি।নানা প্রকৃতির অস্থি রয়েছে মানবদেহে।অস্থিগুলাের সন্ধিস্থলে রয়েছে লালার ন্যায় এক ধরনের তরল পদার্থ,যা অস্থিগুলােকে সংরক্ষণ করে এবং নড়া -চড়া ও উঠা -বসার সময় সাহায্য করে থাকে।তাছাড়া এগুলাের আরাে বিশেষ বিশেষ উপকারীতা রয়েছে।

প্রাণের জন্য দেহ এক অপরিহার্য বস্তু। জীবনের প্রয়ােজনে মানুষ দেহের কাছে দায়বদ্ধ।এই প্রয়ােজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে অস্থিগুলাে পৃথক পৃথক বহু খণ্ডে বিভক্ত করে এক অভিনব পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে প্রয়ােজনে সে সহসাই দেহকে সঞ্চালন করতে পারে বা নাড়াচাড়া করতে পারে। শরীরের অস্থিগুলাে যদি পৃথক পৃথক খণ্ড না হয়ে অখণ্ড একটি অস্থি হতাে ,তাহলে মানুষকে সর্বদা একঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতাে।চলা -ফেরা ,নড়া -চড়া ও উঠা -বসা অসম্ভব হয়ে পড়তাে।অস্থিগুলােকে পরস্পর সংযুক্ত করার জন্য ,এর উপর দিয়ে শিরা - উপশিরা ও মাংসের আবরণ দেয়া হয়েছে। অস্থিগুলাে পরস্পর জুড়ে থাকার জন্য একটির মাথার সাথে অপরটিকে এমনভাবে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে ,যাতে এগুলাে পরস্পর উত্তমভাবে জুড়ে থাকতে পারে। মােটকথা,আল্লাহ তায়ালা তার অসীম কুদরত ও অপার মহিমায় অস্থিগুলােকে এমনভাবে সংযােজিত করে সৃষ্টি করেছেন,যেন মানুষ প্রয়োেজনানুযায়ী নিজ দেহকে নাড়াচাড়া করতে পারে এবং সহসা তার যাবতীয় কাজ সমাধা করতে পারে।

এবার মানুষের মস্তকের প্রতি লক্ষ্য করােঃ কি নিখুঁত ঘঠন ও আকৃতিতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে । ১৫৫ টি হাড়ের সমন্বয়ে মানুষের মস্তক ঘঠিত।হাড়গুলাে একেকটি একেক আকৃতির।আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে হাড়গুলি এমনভাবে সংযােজিত করে দিয়েছেন যে,গােটা মস্তকটি একটি খন্ডে তৈরী হয়েছে।মস্তকের খুপড়ির অংশে ছয়টি হাড় রয়েছে।উপরের অংশে রয়েছে ১২৪ টি হাড়,আর দুটি রয়েছে নীচের জোড়ায় । অবশিষ্ট হাড়গুলাে হলাে ,মুখের অভ্যন্তরে দাবিশেষ ,যা দ্বারা খাদ্যদ্রব্য চিবিয়ে চূর্ণ করা হয়ে থাকে।

ঘাড়ের প্রতি লক্ষ্য করােঃ ঘাড়কে আল্লাহ তায়ালা মস্তকের দপ্তরূপে সৃষ্টি করেছেন।যা গােলা ফাপা সাতটি হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত।হাড়গুলাে একটির উপর একটি সুবিন্যস্তভাবে রক্ষিত।ঘাড়ের নিম্নপ্রান্ত পিঠের মেরুদণ্ডের উপর স্থাপিত করা হয়েছে।এই মেরুদণ্ড আবার ৩৪ টি হাড় দ্বারা গঠিত।হাড়গুলাে পর্যায়ক্রমে প্রলম্বিত কোমর পর্যন্ত।কোমরে রয়েছে তিনটি হাড় পিঠের হাড় নিচের দিকে লেজবিশিষ্ট হাড়ের সাথে সংযুক্ত।সেখানেও রয়েছে তিনটি হাড়ের সমন্বয়।পাজর ,বক্ষ ,কাঁধ ,হাত ,পা ও নিতম্বের হাড় অত্যন্ত চমৎকারভাবে পৃষ্ঠদেশের হাড়গুলাের সাথে সংযােজিত । হাড়ের এ সুবিন্যাস ও সুগঠনে আল্লাহ পাকের এক অপার হিকমত নিহিত রয়েছে।এই ক্ষুদ্র পরিসরে যার বর্ণনা দেয়া প্রায় অসম্ভব । মানব দেহ মােট ২৪৮ টি হাড় দ্বারা গঠিত । অবশ্য ফাকা স্থান পূর্ণ করার জন্য যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাড়সমূহ রয়েছে তা এ হিসেবের বাহিরে।

আল্লাহ্নপাকের অপার হেকমত ও অসীম কুদরতের প্রতি লক্ষ্য করােঃ তিনি বীর্যের ন্যায় অপবিত্র পদার্থ থেকে মানব দেহ সৃষ্টি করেছেন।এতে রয়েছে আল্লাহর অশেষ মহিমা ও অসীম কুদরতের নিদর্শন।তিনি তাঁর নিপুণ সৃষ্টি কুশলতায় যে অবয়বে মানব দেহ সৃষ্টি করেছেন তাতে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন বা হ্রাস-বৃদ্ধির অবকাশ নেই।এতে সামান্য পরিবর্তন করতে যাওয়ার অর্থই হলাে নানা সমস্যার সৃষ্টি করা।এতে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরতের নিদর্শন ও চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় ।

দেহের অভ্যন্তরে প্রতিটি অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ বা অংশের প্রতি লক্ষ্য করােঃ এগুলােকে কেমন সুন্দর সুবিন্যস্ত ও সুশৃংখলভাবে গঠন করা হয়েছে।প্রয়ােজনের সময় যাতে হাড়গুলাে নড়াচড়া করতে পারে বা বাঁকা -সােজা হতে পারে,সেজন্য মাংসপেশী ও ঝিল্লী দ্বারা কতগুলাে বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে।এগুলাে মােট ৫২৯ টি এগুলাে কোনটা ছােট ,কোনটা বড় আবার কোনটা চওড়া ,কোনটা সরু।এর মধ্যে ২৪ টি চোখের পলক সঞ্চালনের সময় বিভিন্ন কাজ করে থাকে।যদি এর একটিও কম হতাে ,তাহলে চোখের কার্যকারিতায় ব্যাত্যয় ঘটততা এবং দৃষ্টিশক্তি অসাড় হয়ে পড়তাে।অনুরূপ প্রত্যেক অঙ্গের জন্য বিভিন্ন অংশ রয়েছে। প্রয়ােজনানুসারে এক একটি এক এক আকারের।অতঃপর শিরা -উপশিরা ,পেশী, ঝিল্লী ইত্যাদির অবস্থান ও বিন্যাস এবং তার গুঢ় রহস্য আরাে বিস্ময়কর।এগুলাের প্রকৃতিগত গুণাগুণ ও কার্যকারিতার বিষয়ে মানুষ সম্যকভাবে অজ্ঞাত।

মানুষের দেহ ও অঙ্গ -প্রত্যঙ্গের প্রতি লক্ষ্য করােঃ তা অন্যান্য প্রাণী থেকে ভিন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মানব দেহকে আল্লাহ পাক সােজা ও সরল অবয়বে সৃষ্টি করেছেন।যেন বসলেও তার সুন্দর গঠন ও অকৃতি বহাল থাকে।বসা অবস্থায় সে উভয় হাত দিয়ে অনায়াসে কাজ কর্ম করতে পারে।মানুষকে আল্লাহ পাক অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় উপুড়মুখী করে সৃষ্টি করেননি।যদি মানুষকেও অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় উপুড়মুখী করে সৃষ্টি করা হতাে ,তাহলে এখন সে যেসব কাজ অনায়াসে করতে পারছে তখন তার পক্ষে সেসব কাজ করা সম্ভব হতাে না।

মানব দেহের অভ্যন্তরে ও বর্হিভাগের প্রতি লক্ষ্য করােঃ সব কিছুতেই রয়েছে আল্লাহ পাকের সৃষ্টিকুশলতার বিস্ময়কর নিদর্শন।দেহের অঙ্গ -প্রতঙ্গগুলাে কেমন সুঘটিত ও পরিপূর্ণ। পরিমিত আহারে অঙ্গ -প্রত্যঙ্গগুলাে শক্তি সঞ্চয় করে ও বৃদ্ধি পায়।আল্লাহ তায়ালা মানব দেহের যাবতীয় অঙ্গ -প্রত্যঙ্গকে নির্দিষ্ট আকারে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।যদি খাদ্যের আধিক্যে(শরীরের তুলনায়)অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেত এবং ভারী ও স্থূল হয়ে যেত,তাহলে মানুষের পক্ষে চলা-ফেরা ও কাজ - কর্ম কষ্টসাধ্য হয়ে পড়তাে।এটা মহান আল্লাহ পাকের অশেষ অনুগ্রহ যে,তিনি মানব দেহের প্রতিটি অংশকে পরিমিত আকারে নিয়ন্ত্রিত রেখেছেন।অন্যথায় তার পক্ষে কাজ -কর্ম,চলা -ফেরা এক কথায় জীবন -যাপনের যাবতীয় ক্ষেত্রে সৃষ্টি হতাে সমস্যা।

মােটকথা,মানবদেহের প্রতিটি স্তরে,প্রতিটি অংশে আল্লাহ তায়ালার অশেষ করুণা ও কুদরতের সুকোমল পরশ রয়েছে।আর নিহিত রয়েছে সীমাহীন রহস্য ও হিকমত , যা মানুষের ধারণার বাহিরে ।

অতঃপর লক্ষ্য করােঃ আসমান ,জমিন ,চন্দ্র -সূর্য ,নক্ষত্র ইত্যাদির সুশৃংখলতা ও সৌন্দর্যের প্রতি।এসব অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যেও রয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম কুদরত ও অশেষ হেকমত।ভেবে চিন্তে যার কোন সীমা পরিসীমা পাওয়া যাবে।এসব সৃষ্টবস্তুর আকৃতি -প্রকৃতি ,বিন্যাস ,একটি থেকে অপরটির বিভিন্নতা ও ব্যবধান ,পূর্ব - পশ্চিমের দূরত্ব ,এসবকিছুই মহান আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত ও অনন্য সৃষ্টি- কুশলতার নিদর্শন।এসবের প্রতি গভীর মনোেযােগে লক্ষ্য করলে হৃদয়ে একটি দৃঢ় বিশ্বাসের জন্ম হবে যে,সৃষ্টিজগতের একটি ক্ষুদ্র অংশও আল্লাহর কুদরত ও নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নয়, বরং এর প্রতিটি অণু-পরমাণু রয়েছে তাঁর সুনিয়ন্ত্রণে এবং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে অশেষ হেকমত।আমাদের স্বল্প জ্ঞানে যার ধারণা করা অসম্ভব।

মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

 ءَاَنۡتُمۡ اَشَدُّ خَلۡقًا اَمِ السَّمَآءُ ؕ  بَنٰہَا  رَفَعَ سَمۡکَہَا فَسَوّٰىہَا

অর্থাৎ “ তােমাদের সৃষ্টি অধিক কঠিন না আকাশের , যা তিনি নির্মাণ করেছেন ? তিনি একে উচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন । (সূরা নাজিয়াতঃ২৭-২৮)

পৃথিবীর সকল মানুষ ও জ্বিন যদি একত্রিত হয়ে পূর্ণ মেধা ও শক্তি প্রয়ােগ করে বীর্য থেকে একটি জীবন সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে তবে তারা বিফল হবে।বরং তা থেকে একটি চোখ ,একটি কান বা অন্য কোন একটি অঙ্গও তারা বানাতে পারবে না।আল্লাহ পাক তাঁর অশেষ কুদরতে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।আর সেখানেই অবয়ব দান করেছেন।প্রতিপালন করেছেন এবং প্রয়ােজানুযায়ী ও পরিমিত আকারে অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ দান করেছেন।শরীরের অভ্যন্তরে পুষ্টি সাধন এবং বাহিরে বৃদ্ধির জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তা উদরে সহসা পৌছার জ্য পথ সৃষ্টি করা হয়েছে।দেহের অভ্যন্তরে জীবনের জন্য অপরিহার্য অংশ হৃদপিণ্ড ,কলিজা ,প্লীহা ,জরায়ু ,মুত্রাশয়, কিডনী ,ফুসফুস ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এগুলি আবার পরিমিত আকারে এবং যথাস্থানে স্থাপন করা হয়েছে।এগুলির প্রত্যেকটির কাজও ভিন্ন ভিন্ন।সকলেই নিজ নিজ কাজে সদা তৎপর।এগুলাের মাধ্যমেই দেহ শক্তি সঞ্চার করে সজীব ও সতেজ হয়। খাদ্য পরিপাকের জন্য পাকস্থলীকে প্রয়ােজনীয় ও কার্যকর উপাদান দ্বারা তৈরী। করা হয়েছে।

খাদ্যদ্রব্য সহজে পরিপাক হওয়ার জন্য তাকে প্রথমেই দাঁতের সাহায্যে মিহিন করে পাকস্থলীতে প্রেরণের সুব্যবস্থা করা হয়েছে ,যেন খাদ্যকে পরিপাক করতে পাকস্থলীর খুব বেশী বেগ পেতে না হয়।কলিজা খাদ্যের নির্যাস থেকে রক্ত তৈরীর কাজ করে এবং খাদ্যের সুপ্রতিক্রিয়া বা প্রভাব সকল অঙ্গ - প্রত্যঙ্গে পৌছে দেয় । প্লীহা ও গুর্দা কলিজার কাজে সহায়তা করে । প্লীহার কাজ হলাে ,রক্তে খাবার অংশ সংগ্রহ করা এবং পীতকে রক্ত থেকে পৃথক করা। গুর্দার কাজ হলাে ,খাদ্যের নির্যাস থেকে তরল অংশকে পৃথক করে তা পেশাবের রাস্তা দিয়ে বের করে দেয়া।কলিজা সারা শরীরে রক্ত পৌছে দিতে সাহায্য করে রক্তের সারাংশ যা মাংসের সারাংশ থেকে সূক্ষ্ণ ও নির্মল তা হৃৎপিণ্ডে পাত্রস্থিত বস্তুর ন্যায় সঞ্চিত থাকে। সেখান থেকে তা প্রয়ােজনানুসারে দেহের বিভিন্ন অংশে বণ্টিত হয়ে থাকে।এসবই আল্লাহ তায়ালার অশেষ কুদরত ,যার পূর্ণ ব্যাখ্যা করা ও অনুধাবন করা মানব শক্তির বাহিরে।বরং তা চিন্তা করতে গেলেও বিস্ময়ের সীমা থাকে না।

গর্ভাশয়ের প্রতি খেয়াল করােঃ আল্লাহ পাক একে কেমন বিস্ময়কর উপাদানে সৃষ্টি করেছেন।এর অভ্যন্তরেই সন্তান সৃষ্টি হয় ও বৃদ্ধি পায় এবং সেই সন্তানের প্রয়ােজন মতাে খাদ্যও সেখানে কুদরতিভাবে পৌঁছে যায়।সেই সন্তানের জন্য আল্লাহ পাক মায়ের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন অপরিমেয় ভালবাসা ,স্নেহ ও মমতা।ফলে মা তার সন্তানকে যাবতীয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে ,বুকে আগলে রেখে লালন -পালন করে।এই মমতার কারনে মা তার সন্তানের সুখের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতেও কুণ্ঠাবােধ করে না।আল্লাহ পাক যদি মায়ের অন্তরে সন্তানের জন্য এরূপ মায়া-মমতা সৃষ্টি না করতেন ,তাহলে কোন মা -ই কষ্ট স্বীকার করে সঠিকভাবে সন্তান লালন-পালন করতাে না।বরং কষ্টের কারণে তিক্ত-বিরক্ত হয়ে সন্তান থেকে দূরে থাকতাে।ফলে অধিকাংশ সন্তানই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারতাে না,যা মানব জীবনের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিত।

ধীর ধীরে শিশু যখন বড় হয় ,তার অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ ক্রমে সবল ও শক্তিশালী হয়েউঠে।আল্লাহ পাক তার মুখে দাঁত গজিয়ে দেন।অতঃপর সে দুধ ছেড়ে তুলনামুলক শক্ত খাদ্যদ্রব্য খেতে শুরু করে।ক্রমশঃ তার দেহ অবয়ব বৃদ্ধি পায়।এবং সাথে সাথে বিবেক - বুদ্ধিও বৃদ্ধি পায়।এভাবেই একদিন মানুষের স্থূল দেহ এবং জ্ঞান -বুদ্ধি পূর্ণতা লাভ করে। আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত ও মহিমার প্রতি লক্ষ্য করােঃ

মানব সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন সে থাকে দুর্বল ,নির্বোধ ও অজ্ঞ।তার থাকে না কোন বিবেক -বুদ্ধি ,থাকে না ভাল -মন্দ যাচাইয়ের জ্ঞান।মানব সন্তানকে যদি জন্মের সাথে সাথেই জ্ঞান,বিবেক দান করা হতাে ,তাহলে সে পৃথিবীতে এসে এতাে নতুন নতুন জিনিস দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে যেত এবং দিশেহারা হয়ে পড়তো।অতঃপর সে নিজের প্রতিও লক্ষ্য করতাে,তাকে পুরাতন নেকড়ায় জড়িয়ে কোলে নেয়া হচ্ছে।দোলনায় শুইয়ে লালন -পালন করা হচ্ছে।শিশুর দেহ অত্যন্ত কোমল ও দুর্বল হওয়ায় এভাবেই তাকে প্রতিপালন আবশ্যক।কিন্তু শিশু থেকেই জ্ঞান -বুদ্ধি প্রাপ্ত হওয়ার ফলে সে এসব কিছুরই প্রতিবাদ করতাে।সকলের সাথে বিরােধে লিপ্ত হতাে এবং পিতা-মাতাসহ বড়দের সাথে কলহ করতাে ও অবাধ্য হতাে।এতে সন্তানের প্রতি পিতা -মাতার মায়া -মমতা হ্রাস পেত। এমনকি তাকে সুষ্ঠুভাবে লালন -পালনই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়তাে।কিন্তু আল্লাহর হেকমতের বিধান এতই নিখুঁত ও বাস্তব সম্মত যে ,তিনি মানুষের জ্ঞান -বুদ্ধি ধীরে ধীরে ,ক্রমান্বয়ে দান করেন।ফলে সে পর্যায়ক্রমে অল্প অল্প করে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকে।প্রতিটি জিনিসের ব্যবহার ,প্রয়ােজনীয়তা ও আবশ্যকতা সম্পর্কে শিক্ষা অর্জন করে থাকে।

মানুষ যখন পর্যায়ক্রমে শৈশব ও কৈশাের পেড়িয়ে যৌবনে প্রবেশ করে তখন তার দেহ ও মনে এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পুরুষের মুখে দাড়ি -গোঁফ গজায় ,যা তার পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ এবং নারী -পুরুষের মাঝ পার্থক্য সাধন করে।তার দেহে ও অঙ্গে দীপ্তি বিকশিত হয়।চিন্তায় -অনুভূতিতে যৌন চেতনার উন্মেষ ঘটে।এ সমস্তই মানব সমাজে বংশ বৃদ্ধির সহায়ক হয়।অতঃপর এক সময় বার্ধক্যের অমােঘ ও নিষ্ঠুর কষাঘাত যৌবনের সকল লাবণ্য বিলীন হয়ে যায়।

নারীর চেহারা পুরুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন যৌবনে তাদের দেহেও বিশেষ পরিবর্তন আসে।তবে পুরুষের ন্যায় তাদের মুখমণ্ডলে দাড়ি -গোঁফ গজায় না।তাদের মুখ থাকে কোমল,মসৃণ ও কান্তিময়।বালিকার সমস্ত অঙ্গই কমনীয়তা ও রূপ-লবণ্যে সমৃদ্ধ ,যা পুরুষকে সহজে আকর্ষণ করে ,মুগ্ধ করে। নারী ও পুরুষের দেহাবয়ব সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতিতে গঠিত যা পরস্পরের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনােমুগ্ধকর।সৃষ্টির এই কুশলতা ও আকর্ষণের মাঝেই নিহিত রয়েছে বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষার এক মহা কৌশল।

মানব -জ্ঞান ও বিবেক কি একথা বলে যে ,সৃষ্টির এই ধারাবাহিকতা ,এই বিশ্বজগতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তা সবই নিরর্থক? না ,কখনােই নয়।অবশ্যই এই বিশ্ব -জগত এবং কুদরতের এই মহিমা সব কিছুই বেকার ও উদ্দেশ্যহীন নয়।আল্লাহ পাকের এই আসমান -জমিন এবং এর মধ্যে অবস্থিত সকল বস্তু ,সকল অণু -পরমাণু সৃষ্টির পিছনে নিহিত রয়েছে এক মহান ও মহৎ উদ্দেশ্য। মাতৃগর্ভে যখন সন্তানের আবির্ভাব হয় তখন যদি তাকে খাদ্য হিসেবে রক্তের সারাংশ প্রদান করা না হতাে ,তাহলে সে কি সেই অন্ধকার গর্ভে অপুষ্টিতে মৃত্যুবরণ করতাে না?যেমন পানির অভাবে বৃক্ষ ,তরুলতা শুকিয়ে মরে যায়?সন্তান গর্ভে পরিপূর্ণতা লাভের পর যদি প্রসুতি প্রসব বেদনা অনুভব না করতাে।এবং যথা সময়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ না হতাে তাহলে মা ও সন্তান উভয়েরই জীবন বিপন্ন হতাে।সন্তান ভূমিষ্ঠের সাথে সাথেই আল্লাহর অসীম কুদরতে মাতৃস্তনে তার উপযােগী তরল খাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে যায়। যদি সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর শিশুর উপযােগী খাদ্য দুধ ইত্যাদি না পাওয়া যেত তাহলে শিশু রােগাক্রান্ত হয়ে অকালেই মৃত্যুমুখে পতিত হতাে।আবার যখন শিশু একটু বড় হয় তখন তার মুখে দাঁত গজায় এবং সে কিছুটা শক্ত খাদ্য দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খায়।যা তার শরীর ও পুষ্টির জন্য আবশ্যক। যথা সময়ে যদি তার মুখে দাঁত না গজাতাে তাহলে শক্ত দ্রব্য তাকে গিলে খেতে হতাে। ফলে তা বদ-হজম হয়ে সে অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে পড়তাে।

যদি বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর বালকের মুখে দাড়ি -গোঁফ না গজায় ,তাহলে তাকে বালিকার মতাে মনে হয়।দাড়ি -গোঁফহীন বালকের মুখ হয়ে পড়ে সৌম্য ও পৌরুষহীন। 

এবার লক্ষ্য করােঃ মানুষের ভিতর যখন যৌন চেতনা সৃষ্টি হয় তখন ধমনী থেকে বীর্য নিসঃরণের জন্য এক আশ্চর্য উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।অতঃপর সেই বীর্য পুরুষাঙ্গের মাধ্যমে অত্যন্ত শীল ও সঙ্গতভাবে নারীর জরায়ুতে সঞ্চারিত হয় , বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে যা একান্ত অপরিহার্য।আর এসব কিছু সেই মহান আল্লাহ পাকের অসীম কুদরত ও অশেষ অনুগ্রহ ব্যতীত সম্পূর্ণ অসম্ভব। অনুরূপ এর বিপরীত অর্থাৎ বয়ঃপ্রাপ্তির পর যদি বালিকার মুখমণ্ডলে দাড়ি -গোঁফ গজাতাে তাহলে তার লাবণ্য ও কমনীয়তা ক্ষুন্ন হতাে এবং এটা বিকর্ষণের কারণ হতাে। 

এবার লক্ষ্য করােঃ স্ত্রী-যৌনীর গঠন ও তার কার্যকারিতা কত সঙ্গত।এতে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে ,কোন সৃষ্টিই বেকার বা অহেতুক নয়।প্রতিটি সৃষ্টির পিছনেই রয়েছে আল্লাহ পাকের অশেষ কুদরত ও হেকমত।

দেহের প্রতিটি অঙ্গ - প্রতঙ্গের কাজের প্রতি লক্ষ্য করােঃ দেহের প্রতিটি অঙ্গই কোন না কোন কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রতিটি স্ব স্ব কাজ যথারীতি আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। আর প্রতিটি অঙ্গকেই তার কাজের উপযােগী আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রতিটি অঙ্গই তাদের স্ব স্ব কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে।প্রতিটি অঙ্গ নিয়ে একটু চিন্তা করলেই একথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে য,এসব কিছুতেই রয়েছে আল্লাহর অসীম কুদরতের সুস্পষ্ট নিদর্শন।

এবার লক্ষ্য করােঃ খাদ্যদ্রব্য পাকস্থলীতে পৌছার পর তা কিভাবে পরিপাক হয়।সূক্ষ্ম তন্ত্রীর সাহায্যে খাদ্যের মূল নির্যাস হৃৎপিণ্ডে গিয়ে পৌছে। স্নায়ুতন্ত্রীগুলােকে সূক্ষ করে সৃষ্টি করা হয়েছে ,যাতে খাদ্যের উপকারী ও প্রয়ােজনীয় পদার্থ হৃদপিণ্ডে গিয়ে পৌঁছতে পারে এবং দুষিত ও অপ্রয়ােজনীয় পদার্থ হৃদপিণ্ডে প্রবেশ করতে না পারে ,যা দেহের জন্য ক্ষতিকর ।কাজের ক্ষেত্রে সূক্ষ্মতন্ত্রীগুলাে প্রায় ঝিল্লীর সম পর্যায়ের। এগুলাে পরিপাক করা খাদদ্রব্যের প্রয়ােজনীয় ও বিশুদ্ধ নির্যাস হৃদপিণ্ডে পৌঁছে দেয়।হৃদপিণ্ড এই বিশুদ্ধ নির্যাসকে রক্তে পরিণত করে।আল্লাহর অসীম কুদরতে এভাবেই খাদ্যদ্রব্য থেকে রক্তের সৃষ্টি হয়। এখান থেকে সূক্ষতন্ত্রীর সাহায্যে সর্বাঙ্গে রক্ত সরবরাহ হয়।খাদ্যের মূল নির্যাস এভাবে পৃথক হওয়ার পর অবশিষ্ট যে নিকৃষ্ট বস্তু থাকে তা মলমূত্র হিসেবে যথাস্থানে জমা হয়। হৃদপিণ্ড যেন দেহের একটি মূলকেন্দ্র। সেখানে দেহের জন্য উৎকৃষ্ট খাদ্য সঞ্চিত হয় এবং প্রয়ােজনানুযায়ী তা দেহের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে।

মানবদেহে এমন কোন অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ নেই যা অনর্থক বা প্রয়ােজনহীন।মহান আল্লাহ তায়ালা চোখকে সৃষ্টি করেছেন দেখার জন্য এবং প্রতিটি আসবাব চেনার জন্য।বস্তুর আকার - আকৃতি ,প্রকৃতি ,ধরন ,রূপ ,রং এর পার্থক্য, ছােট -বড় ও বস্তুর এসব গুণাগুণ ও অবস্থা নির্ণয় করা কিছুতেই সম্ভব হতাে না।সারা জগতকে যদি আলােয় আলােকিত করে দেয়া হতাে ,আর চোখের দৃষ্টি না দেয়া হতাে, তাহলে এ আলাের কোনই মূল্য থাকতাে না এবং আলাে কোন কাজেই আসতাে না। অপর পক্ষে আলােহীন পৃথিবীতে দৃষ্টিশক্তিও অনর্থক হয়ে পড়তাে।কেননা নিরেট অন্ধকারে চোখ কিছুই দেখতে পায় না। আলাে আছে বলেই তাে দৃষ্টিশক্তি এতাে কার্যকর।দৃষ্টির সাহায্যে বস্তুর পার্থক্য করণের জন্যই বিভিন্ন রংয়ের সৃষ্টি করা হয়েছে।

কানকে আল্লাহ শব্দ শ্রবণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।পৃথিবীতে যদি শব্দই থাকতাে এবং শ্রবণশক্তি না থাকতাে কিংবা আদৌ কানই না থাকতাে,তাহলে শব্দের উপকারিতা ও কার্যকারিতা নিষ্ফল হয়ে যেত।অনুরূপ প্রতিটি ইন্দ্রিয়েরই যথেষ্ট প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে।ইন্দ্রিয় ও অনুভূতির মাঝে রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক । ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই অনুভূতির সৃষ্টি হয়।ইন্দ্রিয় ব্যতীত অনুভূতির অস্তিত্বই অর্থহীন।যেমন শ্রবণ ও দর্শনেন্দ্রিয়ের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বায়ু ও আলাের অপরিহার্য ভূমিকা।অর্থাৎ ,যদি বায়ু না থাকতাে তাহলে কানে শব্দই পৌছতাে না, কানের অস্তিত্ব নিরর্থক হয়ে পড়তাে।যদি আবার আলাে না থাকতাে ,তাহলে দর্শনেন্দ্রিয়ও অকর্মা হয়ে পড়তাে।

অন্ধ ও বধিরের প্রতি লক্ষ্য করােঃ আল্লাহ পাকের এ দুটি বিশেষ নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তাদেরকে কেমন সমস্যা ভােগ করতে হয়।অন্ধ যখন চলাফেরা করে তখন সে জানতে পারে না যে ,সে কোথায় পা ফেলবে বা পা ফেলছে । কোন বিপজ্জনক গর্তেই পা ফেলছে ,না কোন অনিষ্টকর প্রাণীর উপর পা ফেলছে।সামনে তার মসৃণ সমতল পথ ,নাকি উঁচু -নীচু বিপজ্জনক পথ ,সে কিছুই জানে না।সামনে থেকে যদি কোন ভয়ানক বিপদ আসে তাও তার দেখার বা বুঝার উপায় নেই।সৃষ্টির বহু সুযােগ -সুবিধা ও অবদান থেকে সে বঞ্চিত। পৃথিবীর যাবতীয় রং ও বর্ণ সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন ,লাল ,হলুদ ,কালাে -সাদা,নীল - সবুজ সবই তার কাছে সমান একই।

বধির ,যে শ্রবণশক্তি থেকে বঞ্চিত,সে বেচারা শব্দ ও কথার মাধুর্য অনুভব করতে অক্ষম। শব্দ ও কথার মাধুর্য ও লালিত্য থেকে সে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।শ্রুতিমধুর শব্দ এবং কর্কশ ও অপ্রিয় শব্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতাও তার নেই।শব্দ কানে প্রবেশ করলেই শ্রবণশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি তার তারতম্য অনুভব করতে পারে।কিন্তু বধিরের পক্ষে শব্দের তারতম্য অনুভব করা অসম্ভব।সে কোন জনসভায় ,মজলিসে থাকুক বা ঘরে বসে থাকুক কিংবা কেহ তাকে লক্ষ্য করে কিছু বলুক ,তার জন্য সবই সমান।সে মজলিসে উপস্থিত থেকেও যেন অনুপস্থিত।জীবিত থেকেও যেন সে মৃত মানুষ।

আর যে ব্যক্তি জ্ঞান ও বিকেকের ন্যায় অমূল্য নিয়ামত থেকে বঞ্চিত ,অর্থাৎ উম্মাদ -পাগল তার অবস্থাতাে পশু থেকেও করুণ।পশুরতাে ভাল - মন্দের পার্থক্য করতে পারে।কিন্তু পাগল তাও পারে না ,কেননা সে জ্ঞান থেকেই বঞ্চিত।এবার সামগ্রিকভাবে আল্লাহ পাকের দেয়া সকল অঙ্গ - প্রতঙ্গ তথা শ্রবণ ,দর্শন , স্পর্শ ,স্বাদ গ্রহণ ইত্যাদি শক্তির প্রতি লক্ষ্য করাে ,যার সাহায্যে মানুষ জীবনের যাবতীয় প্রয়ােজন মিটায়।যদি এসব অঙ্গ -প্রত্যঙ্গের একটি না থাকতাে বা ত্রুটিযুক্ত হতাে তাহলে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপনে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতাে এবং এটা তার জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভাগ্য হতাে।

যেসব অসহায় ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক কোন একটি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ থেকে বঞ্চিত করেছেন নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদেরকে কঠিন পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত করেছেন । এসবের অভাবের ফলে আল্লাহর অমূল্য নিয়ামতকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারবে । এ ক্ষেত্রে ধৈর্য্যের পথ অবলম্বন করা ব্যতীত তার জন্য কল্যাণকর কোন পথ নেই । সুতরাং সে যদি এই অভাবের ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও দুঃখ ,ধৈর্যের সাথে সহ্য করে যেতে পারে তাহলে ইনশাআল্লাহ সে আখেরাতে এর বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে অশেষ পুরস্কার লাভ করতে সক্ষম হবে।

আল্লাহর অফুরন্ত কুদরত ও রহমতের প্রতি লক্ষ্য করাে , সর্বদা সর্বাবস্থায় তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল।দান করার ক্ষেত্রে বান্দার কৃতজ্ঞতার জন্য এবং বঞ্চিত করার বেলায় সবরের জন্য আল্লাহ পুরস্কৃত করবেন !মানব দেহের অঙ্গ -প্রত্যঙ্গের প্রতি লক্ষ্য করাে ,কোন কোন অঙ্গ একটি , আবার কোন কোন অঙ্গ জোড়া।এসব অঙ্গের কর্ম - ক্রিয়ার প্রতি লক্ষ্য করাে ,তারা কতাে সুষ্ঠুভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে । 

মস্তকের কথাই ধরােঃ  একটিমাত্র মস্তক ,অথচ কতাে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব তার উপর। মস্তকের উপর যদি সাধ্যের বাহিরে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে তার জন্য তা কষ্টকর হয়ে পড়বে।আর একটির স্থানে মাথা যদি দু’টো হতাে তাহলেও নানা সমস্যা দেখা দিতাে।একটি যখন কথা বলতাে তখন অন্যটিকে নিশ্ৰুপ থাকতে হতাে।উভয়ে যদি একই কথা বলতাে তাহলেও তখন একটিকে নিষ্ক্রিয় থাকতে হতাে।আর যদি দু’টি মস্তক দু'ধরনের কথা বলতাে ,তাহলে তাদের মধ্যে মতবিরােধ দেখা দিতাে ,উদ্দেশ্য ব্যক্তিকে বিভ্রান্তিতে পড়তে হতাে।কোনটি আসল ও কোনটি সঠিক কথা তা বুঝা তার পক্ষে অসম্ভব হতাে।এতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতাে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুটি হাত দিয়েছেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু কাজ রয়েছে যা এক হাতে সম্পাদন করা অসম্ভব। যদি একটি হাত হতাে তাহলে অনেক সমস্যায় পড়তে হতাে।কাজের প্রেক্ষিত ও প্রয়ােজন হিসেবে মানুষের দুটি হাত হওয়াই অপরিহার্য।যেসব অসহায় লােকের এক হাত পঙ্গু বা বেকার তাকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবে বিভিন্ন কাজে তাকে কতাে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।এক হাতবিশিষ্ট ব্যক্তি কখনােই দু হাতবিশিষ্ট ব্যক্তির ন্যায় কাজ করতে পারে না।উপরন্তু কষ্ট ও ব্রিতকর অবস্থার কথা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে দু'টি পা হওয়াও অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।যদি একটি পা হতাে তাহলে মানুকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটতে হতাে।হয়ত চলাও সম্ভব হতাে না।এবার সেই অঙ্গটির প্রতি লক্ষ্য করাে ,যার মাধ্যমে শব্দের সৃষ্টি ও উৎপত্তি হয়।তা কতাে নিখুঁত ও সুগঠিত।জিহ্বা ,দাঁত ও ওষ্ঠদ্বয় শব্দকে বর্ণে ও কথায় পরিণত করার কাজে বিশিষভাবে সহায়তা করে। মুখে যদি এসব না থাকতাে তাহলে পরিপূর্ণ নিখুঁত বর্ণ সৃষ্টি ও পরস্পরে ভাব আদান - প্রদানের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিত।

শ্বাসনালী শব্দ বের করে এবং বায়ু ফুসফুস পর্যন্ত পৌছে দেয়।এতে হৃৎপিণ্ড সুস্থ ও সতেজ থাকে।কিছু সময়ের জন্যও যদি এই নালী বন্ধ করে রাখা হয় কিংবা আদৌ যদি এই নালীর ব্যবস্থা না থাকতাে তাহলে হৃৎপিণ্ড অস্থির ও দুর্বল হয়ে পড়তাে।

খাদ্য গ্রহণের সময় জিহ্বার সাহায্য নেয়া হয়ে থাকে।দাঁত দিয়ে খাদ্য চর্বন ও পেষণের কাজ করা হয়।পানাহারের ক্ষেত্রে ওষ্ঠদ্বয়েরও বিশেষ সহায়তা থাকে।তাছাড়া ওষ্ঠদ্বয় মুখ - গহ্বরের কবাটের কাজও করে থাকে।

এসব আলােচনা দ্বারা এ কথাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে ,মানুষের শরীরের সকল অঙ্গসমূহ বিভিন্ন কাজে নিয়ােজিত রয়েছে। কোন অঙ্গই কর্ম বা উপকারহীন নয়।যদি অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় কিছুমাত্র কম - বেশী হতে তাহলে তার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হতাে এবং অনেক কাজই জটিল হয়ে পড়তাে।এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি অঙ্গকে পরিপূর্ণ ও কার্যপােযােগী করে সৃষ্টি করেছেন।

মাথায় অবস্থিত মগজের প্রতি খেয়াল করােঃ যা সকল বােধ ও অনুভূতির উৎসস্থল।একে যদি উম্মুক্ত করাে , তবে দেখবে তা পরস্পর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিজড়িত।আঘাত ও নানা দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত নাজুক মগজকে শক্ত ও প্রতিহতশীল খুপড়ি দ্বারা ঢেকে রাখা হয়েছে। সেই খুপড়ি আবার সুদৃশ্য চুল দ্বারা অচ্ছাদিত ,যা মস্তকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং শীত - গ্রীষ্মসহ যাবতীয় প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।আল্লাহ পাকের কুদরত ও সৃষ্টির চূড়ান্ত নৈপুণ্যের প্রতি লক্ষ্য করাে। মগজের মতাে কোমল ও নাজুক বস্তুকে সুরক্ষার জন্য তিনি কেমন উত্তম ব্যবস্থা করেছেন।সুরক্ষার এই সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকলে নানা প্রতিকূলতায় মগজ অচিরেই বিনষ্ট হয়ে যেত এবং মানুষের বিবেক - বুদ্ধি ও সকল অনুভূতি অকেজো হয়ে পড়তাে।কেননা মগজ - মস্তিষ্ক ছাড়া কোন প্রকারের অনুভূতিরই অস্তিত্ব কল্পনাতীত।

হৃৎপিণ্ডের প্রতি খেয়াল করােঃ  তা বুকের শক্ত ও বদ্ধ পিঞ্জরে কিভাবে সংরক্ষিত।তার উপর রয়েছে সূক্ষ চামড়ার বিশেষ আবরণ।আর তা গােশত ও শিরা - উপশিরা দ্বারা সুনিপুণভাবে আচ্ছাদিত রয়েছে।দেহের মধ্যে হৃৎপিণ্ডই সর্বপ্রধান ও মূল অংশ এবং দেহ - রাজ্যের বাদশাহ । এই জন্যই তাকে এহেন সুবেষ্টন দ্বারা সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করা হয়েছে।

গলার প্রতি লক্ষ্য করােঃ এতে দু'টি পথ রয়েছে।একটি পথ শব্দ বের হওয়ার জন্য।একে শ্বাসনালী বলে এবং এটি ফুসফুস পর্যন্ত প্রসারিত।আরেকটি পথ খাদ্য প্রবেশের জন্য।একে খাদ্যনালী বলে এবং এটি পাকস্থলী পর্যন্ত প্রসারিত।গলার মধ্যে একটি পর্দা রয়েছে ,যাতে শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে খাদ্য প্রবেশ করতে না পারে। আবার ফুসফুসকে পাখার ন্যায় তৈরী করা হয়েছে ,যা হৃৎপিণ্ডকে বায়ু দ্বারা সজীব রাখে এবং উত্তাপ ও প্রতিবন্ধকতার জন্য তার কাজে যেন কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি না হয় সেদিকেও সক্রিয় থাকে ফুসফুসের ভিতরের

ফাকা স্থল বায়ুপূর্ণ করে রাখা হয়েছে ,যাতে হৃৎপিণ্ড সর্বদা বায়ু গ্রহণ করতে পারে। অন্যথায় বায়ুর অভাবে হৃৎপিণ্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে কিংবা প্রাণনাশও হতে পারে।

মল-মূত্র ত্যাগের রাস্তার প্রতি খেয়াল করােঃ  আল্লাহ তায়ালা কি পরম কৌশলে ও নৈপুণ্যে তা সৃষ্টি করেছেন । কেবলমাত্র প্রয়ােজনের সময়ই অর্থাৎ পেশাব - পায়খানার বেগ হলেই উক্ত অঙ্গদ্বয় সক্রিয় হয়ে উঠে । অন্য সময় তা বন্ধ থাকে এবং তা থেকে কোন কিছুই নির্গত হয় না । যদি সেই দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত থাকতাে এবং তা থেকে অনবরত মল - মূত্র নির্গত হতে থাকতাে , তাহলে মানুষকে মারাত্মক ব্রিতকর অবস্থায় পড়তে হতাে এবং চলাফেরাও দুর্বিষহ হয়ে পড়তাে । তাছাড়া মানুষ কখনাে পাক - পবিত্র থাকতে পারতাে না , যা আমল - ইবাদতের ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য বিষয়

নিতম্ব ও উরুদ্বয়ের প্রতি খেয়াল করােঃ এগুলাে কি সুদৃশ্য ও সুগঠিত করে সৃষ্টি করা হয়েছে । এগুলাে স্থূল ও ভরাট মাংস সমৃদ্ধ । এতে মানুষের উঠতে বসতে যথেষ্ট আরাম ও প্রশান্তি হয় । মাংসবিহীন শীর্ণ নিতম্ব ও সরু উরুবিশিষ্ট মানুষের পক্ষে বসা অত্যন্ত কষ্টকর । তাই নিতম্বকে গদির ন্যায় স্কুল ও নরম করে সৃষ্টি করা হয়েছে ।

মানুষের লিঙ্গের প্রতি খেয়াল করােঃ এতেও আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত ও বিশেষ হিকমত নিহিত রয়েছে । দেখাে , তার গঠন ও প্রক্রিয়া কেমন অদ্ভূত । যদি তা সর্বদা শিথিল ও নিস্তেজ থাকতাে তাহলে মানুষের পক্ষে গর্ভাশয়ে বীর্য সঞ্চার করা সম্ভব হতাে না । আর তা যদি সর্বাবস্থায় উত্তেজিত ও দৃঢ় থাকতাে তাহলে তা হতে ভীষণ অস্বস্তিকর । আল্লাহ পাক তাঁর অসীম কুদরতে একে এমন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করেছেন যে , তা প্রয়ােজনের সময় উত্তেজিত ও দৃঢ় হয় এবং অন্য সময় এমন শিথিল ও নিস্তেজ থাকে যে , মানুষ তার শরীরে এর অস্তিত্বই অনুভব করে না । ঘর - বাড়ীতে মল - মূত্র ত্যাগ করার স্থান বা পায়খানা সবচেয়ে আড়ালে ও নির্জন স্থানে থাকে , যেন মানুষ সেখানে প্রয়ােজনানুসারে শরীর অনাবৃত করে নিশ্চিন্তে বসতে পারে এবং নিরুপদ্রব্যে অস্বস্তিকর বস্তু ত্যাগ করে স্বস্তি লাভ করতে সক্ষম হয় । 

আল্লাহ পাকের হিকমতের প্রতি খেয়াল করােঃ তিনি মলদ্বারকে শরীরের সবচেয়ে প্রচ্ছন্ন স্থানে স্থাপন করেছেন । অতঃপর স্কুল ও মাংসুল নিতম্ব ও উরুদ্বয় দ্বারা আরাে আড়াল করেছেন , যাতে নিম্নাঙ্গ অনাবৃত হলেও তা অনেকটা আড়ালে থাকে।

সৃষ্টির রহস্য কেশ ও নখের প্রতি খেয়াল করােঃ এগুলাের গঠন প্রক্রিয়া কি অদ্ভুত ! এগুলাে পরিবর্ধনশীল । আবার এগুলােকে সহজে কেটে ফেলারও নিয়ম রয়েছে এবং এ কর্তনেও রয়েছে যুক্তিসঙ্গত কারণ ও মঙ্গল । নখ ও কেশকে আল্লাহ অনুভূতিহীন করে সৃষ্টি করেছেন , যেন তা কাটার সময় কোন কষ্ট না হয় । অন্যথায় তা কাটা হতাে অত্যন্ত কষ্টকর । কেহ কেহ কষ্টের ভয়ে হয়ত কাটতােই না । ফলে শরীরের এই অবাঞ্চিত অংশ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে বাজে ও বিশ্রী দেখাতাে।

 অতঃপর কেশ গজাবার স্থানগুলাের প্রতি লক্ষ্য করােঃ এর জন্য কেমন যথাযথ স্থান নির্বাচন করা হয়েছে । যদি চোখের ভিতরে কেশ গজাতাে , তাহলে মানুষ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়তাে , অন্ধ হয়ে যেতাে । কেননা চোখের ন্যায় স্পর্শকাতর ও সূক্ষ অঙ্গের পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব হতাে না । কিংবা মুখের ভিতর যদি চুল বা পশম গজাতাে তাহলে আহার গ্রহণে বিঘ্ন সৃষ্টি হতাে এবং সব কিছুর স্বাদও বিনষ্ট হয়ে যেতাে । অনুরূপ যদি হাতের তালুতে পশম গজাতাে তাহলে কোন কিছু করা , ধরা ইত্যাদি কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হতাে এবং মানুষ নানাবিধ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হতাে । এমনিভাবে যদি নারীর যােনীর অভ্যন্তরে পশম হতাে তাহলে সহবাস বা মিলনের সুখ থেকে মানুষ বঞ্চিত হতাে । আল্লাহ পাকের কুদরত।

হেকমত ও অনুগ্রহের প্রতি খেয়াল করােঃ  তিনি প্রতিটি জিনিস যথাস্থানে সৃষ্টি করে মানুষের শান্তি ও আরামের পথ নিষ্কণ্টক করে দিয়েছেন এবং অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থা থেকে রক্ষা করেছেন । কোন অঙ্গ - প্রত্যঙ্গ এমন স্থানে বা এমনভাবে সৃষ্টি করেননি যা মানুষের জন্য কষ্ট ও অশান্তির কারণ হয় এবং কাজ - কর্মে বিঘ্নের সৃষ্টি হয় ।

আরাে খেয়াল করােঃ আল্লাহ পাক মানব - শরীরে পানাহার , দ্রিা ও সহবাসের প্রয়ােজনীয়তা সৃষ্টি করেছেন এবং হৃদয়ে সেগুলাের অনুভূতিও সৃষ্টি করে দিয়েছেন । যখন আহার ও পানের প্রয়ােজন হয় তখন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সৃষ্টি হয় । পানাহার মানব দেহকে সতেজ রাখার জন্য বা জীবন ধারনের ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য বিষয় । দ্রিা বা ঘুম মানুষের জন্য অতি প্রয়ােজনীয় । নিদ্রা ছাড়া মানুষের দেহমনে প্রশান্তি আসে না এবং শরীরে নতুন শক্তি ও কার্যোদ্যম সৃষ্টি হয় না । বরং দ্রিাহীন ব্যক্তি ক্রমশঃ নিস্তেজ ও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নানাবিধ জটিল রােগে আক্রান্ত হয় । রাতের নির্জনতা ও নিস্তব্ধতায় সম্ভব না হলে দিনে কিছু সময় ঘুমানাের পর মানব - দেহ হয়ে উঠে ঝরঝরে প্রাণবন্ত । দেহে ফিরে আসে নতুন শক্তি ও কাজ - কর্মের উৎসাহ । আখাংখা , আসক্তি ও কামােদ্দীপনা হলাে সহবাসের প্রথম স্তর এবং চূড়ান্ত স্তর হলাে , মিলন বা সম্ভোগ , যা বংশধারা রক্ষার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিষয় । যদি যদি কামােদ্দীপনা ও আসক্তির সৃষ্টি না হতাে তাহলে মানুষ সহবাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকতাে এবং বংশ রক্ষার প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কেও উদাসীন হয়ে পড়তাে।ফলে তার দৈহিক শক্তি হ্রাস পেতে এবং দেহ হয়ে পড়তাে অবসাদগ্রস্ত।যার অনিবার্য পরিণতিতে মানুষের বংশধারা বিলুপ্ত হয়ে যেতাে।

আবার খেয়াল করােঃ বংশ রক্ষা করাই যদি সহবাসের একমাত্র উদ্দেশ্য হতাে,তাতে যদি কোন প্রকরের আসক্তি বা পরিতৃপ্তি ও আনন্দ না থাকতাে, তাহলেও বংশের ধারা ব্যাহত হতাে।কেননা শুধু মাত্র বংশ রক্ষার খাতিরে মানুষ এমন একটি বিরস কর্মের প্রতি মােটেই উৎসাহিত হত না।এখানেই আলাহ পাকের সৃষ্টির অপার হেকমত যে,তিনি মানুষের দেহে ও প্রকৃতিতে এমন এক কামােদ্দীপনা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যে,সে সহজেই সহবাসের প্রতি প্রচণ্ডভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে।যার পরােক্ষ ফলাফল হলাে,সন্তান জন্ম ও বংশের অব্যাহত ধারা রক্ষা করা।

দেহের গঠন ও বিন্যাসের প্রতি খেয়াল করােঃ দেহ একটি রাজ্য স্বরূপ।সেখানে অসংখ্য চাকর ,কর্মচারী বিভিন্ন কাজে নিয়েজিত। একেকজনের উপর একেক কাজ ন্যস্ত। তদুপরি একে অন্যের সহায়তায় সদা তৎপর।প্রাসাদ -গৃহে যদি কোন ময়লা আবর্জনা পড়ে তবে নিয়ােজিত চাকররা তৎক্ষণাৎ তা দূর করে গৃহকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ফেলে। এবার ধরে নাও ,বাদশাহ হলেন সেই স্রষ্টা যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।আর মানবদেহ প্রাসাদ স্বরূপ।দেহে অবস্থিত হাত ,পা ,নাক , কান ,চোখ ইত্যাদি চাকর বা কর্মচারী তুল্য। যদি এগুলাের মধ্যে একটিও কম হয়, তবে দেহে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা দেখা দিবে।চলা- ফেরা ,দেখা -শােনা ,লেন-দেন ইত্যাদি সকল কাজই ওলট-পালট হয়ে যাবে।সঠিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে না।কোন কিছু আদান - প্রদান করতে পারবে না।নিজেকে যাবতীয় বিপর্যয় ও ক্ষতির হাত হতে রক্ষা করতে সক্ষম হবে না।মােটকথা ,কোন একটি অঙ্গের হানী হলে সকল কাজই ব্যাহত হবে। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা অশেষ নিয়ামত স্বরূপ ।

মানব দেহে সমস্ত অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ প্রদান করেছেন সেগুলাের প্রতি লক্ষ্য করােঃ যদি এগুলাে না থাকতাে তাহলে জীবন - যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিয়ের সৃষ্টি হতাে এবং মানব জীবনই বিপর্যস্ত ও অকেজো হয়ে পড়তাে।

স্মৃতিশক্তির প্রতি লক্ষ্য করােঃ নিঃসন্দেহে ইহা আল্লাহ পাকের অসীম কুদরত ও অশেষ নিয়ামত।এর বিপরীতে রয়েছে বিস্মৃতি।অর্থাৎ ভুলে যাওয়া।এটাও আল্লাহ পাকের অশেষ নিয়ামত।এতেও বিশেষ হেকমত ও রহস্য নিহিত রয়েছে।যদি মানুষের মাঝে শুধু স্মরণশক্তিই থাকতাে এবং বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার প্রকৃতি

সৃষ্টির রহস্য থাকতাে তাহলে মানুষ সর্বদা দুঃখ -বেদনার নীল সাগরে নিমজ্জিত থাকতাে।কেননা ,বিস্মৃতি না থাকার কারণে তার মন থেকে কখনাে দুঃখ -কষ্ট ও জ্বালা- যন্ত্রণার দ্বগ্ধ - চিহ্ন মুছে যেতাে না।সর্বদা তার স্মৃতিতে তা জ্বল জ্বল করে জ্বলতাে।ফলে দুনিয়ার সবকিছুই তার বিস্বাদ ও নিরানন্দময় মনে হতাে।কোন কিছুতেই সে স্বাদ বা আনন্দ পেত না।

দুঃখ-কষ্ট ও বেদনায় তার মন এতােই মগ্ন থাকতাে যে,সে জীবনের ব্যাপারে অতিষ্ঠ ও বিমুখ হয়ে পড়তাে।জালেমের অত্যাচার ,হিংসুকের হিংসা ও মন্দলােকের দুর্ব্যবহার ইত্যাদি সর্বদা তার স্মৃতির জগতে প্রজ্জলিত থেকে জীবনকে বিস্বাদ ও দুর্বিষহ করে তুলতাে।এই বিপর্যয় হতে রক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা স্মরণশক্তি ও বিস্মৃতি এই পরস্পর বিরােধী দুই গুণ মানুষের মাঝে এক সাথে প্রদান করেছেন।আর উভয়টির মাঝেই রয়েছে হিকমত ও মঙ্গল।আবার লক্ষ্য করাে ,মানব চরিত্রে আল্লাহ তায়ালা এমসন কিছু বিশেষত্ব ,এমন কিছু গুণ দান করেছেন যা অন্য কোন প্রাণীকে দেয়া হয়নি।

যেমন লজ্জা এই প্রতিক্রিয়াশীল গুণটি আল্লাহ কেবলমাত্র মানুষকেই দান করেছেন।অন্য কোন প্রাণীকে দান করেননি।যদি মানব চরিত্রে লজ্জার গুণ না থাকতাে তাহলে সে গুনাহর কাজ থেকে কখনাে বিরত থাকতাে না।দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অবহেলা করতাে।মেহমানের সম্মান ও আপ্যায়ন করতাে না । সৎ ও নেক কাজের প্রতি আগ্রহী হতাে না এবং অসৎ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতাে না । কেননা মানুষ লােক - লজ্জার ভয়েই অনেক কাজ করে থাকে এবং নেক কাজ থেকে বিরত থাকে।

যেমন ,আমানত আদায় করা ,পিতা - মাতার সেবা করা ,লজ্জাজনক ও আপত্তিকর কাজ থেকে দূরে থাকা প্রভৃতি লােকলজ্জার খাতিরেই করে থাকে।সুতরাং দেখা যাচ্ছে , লজ্জা নামক গুণটির মধ্যে রয়েছে অসংখ্য উপকারিতা ও হিমত।অনুরূপ নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনাতেও রয়েছে সীমাহীন অপকারিতা।অনুরূপ মানব চরিত্রের আরাে বহু গুণ ও স্বভাবের কথা ভেবে দেখাে ,এ সবই আল্লাহ তায়ালার অশেষ নিয়ামত এবং এর মধ্যে অসংখ্য হিকমত ও রহস্য বিদ্যমান রয়েছে।বাকশক্তির কথা একবার চিন্তা করে দেখাে,এই বিশেষ গুণের কারণে মানবজাতি অন্য সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ।বাকশক্তির মাধ্যমে সে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং অন্যকে তা সহজে বুঝতে পারে। অনুরূপ অন্যের কথাও বুঝতে পারে।যদি আল্লাহ তায়ালা মানজাতিকে বাকশক্তির মত এই মহান নিয়ামত দান না করতেন তাহলে তারা পরস্পর ভাবের আদান - প্রদান করতে সক্ষম হতাে না এবং বহু জটিল সমস্যাই অমিমাংসিত থেকে যেতাে।

এভাবে লেখনী শক্তির প্রতি খেয়াল করাে, এর সাহায্যেই আজ মানুষ হাজার হাজার বছর পূর্বের ইতিহাস ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা জানতে পারছে।অনুরূপ হাজার বছর পরের লােকেরাও আমাদের ইতিহাস ও অবস্থা জানতে পারবে।এই লেখার সাহায্যেই সাহিত্য ,সংস্কৃতি ,ইতিহাস গনিত ইত্যাদি শাস্ত্র যুগ যুগ ধরে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।বিস্মৃত ইতিহাস বা ভুলে যাওয়া জ্ঞান মানুষ লিখিত বই-পুস্তকের সাহায্যে জানতে পারে বা পুনরায় স্মরণ করতে পারে।লেখার দ্বারা পত্র মারফত দূর -দূরান্ত থেকে মানুষ পরস্পর খবর আদান - প্রদান করতে পারে।তা ছাড়া অনেক দলিল - পত্র ,চুক্তি প্রভৃতি এই লেখনীর মাধ্যমেই সহজে সংরক্ষণ করা হয়। যদি আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে লেখার মত অপরিহার্য কৌশল দান না করতেন তাহলে আমরা পূর্ববর্তীদের ইতিহাস ,সভ্যতা- সংস্কৃতি ,জ্ঞান -বিজ্ঞান কোন কিছু সম্পর্কেই জনতে পারতাম না এবং পৃথিবীর যাবতীয় ইতিহাস ও জ্ঞান -বিজ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে যেতাে। তখন জ্ঞান -বিজ্ঞানের সােনালী পরশ থেকে বঞ্চিত হয়ে আমাদের অন্ধকারের তথা অজ্ঞ ও বর্বরতার জীবন যাপন করতে হতাে।ফলে ব্যক্তি ,সমাজ ও রাষ্ট্র সকল ব্যবস্থাই জটিল সমস্যায় নিপতিত হতাে এবং জীবনের স্বতঃস্ফুর্ত গতিও ব্যাহত হয়ে পড়তাে। এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে ,এ লেখার কৌশল তাে মানুষেরই উদ্ভাবিত শিল্প।

এটা কোন ঐশিক বা প্রকৃতিগত দান নয়। কেননা পৃথিবীতে আরবী ভাষাসহ রােমান, হিব্রু , ফার্সি ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষা রয়েছে এবং এসব লেখার ধরনেও বিভিন্নতা লক্ষণীয়। এর উত্তর হলাে ,উপরােক্ত কথার অর্থ ,লেখনী - শক্তি অর্থাৎ হস্ত ও অঙ্গুলি দ্বারা বর্ণমালা লেখার শক্তি আল্লাহরই দান।তাছাড়া যে মেধা ও বুদ্ধি দ্বারা মানুষ লেখা -শিল্প উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছে তাওতাে আল্লাহর দান।আবার ভেবে দেখাে ,কথা বলার সময় যদি চিন্তা - ভাবনার ধারিবাহিকতা গতিশীল ও পরিমিত না হত , তাহলে মানুষ গুছিয়ে কথাই বলতে পারতাে না।

সব তালগােল পাকিয়ে যেত।সুতরাং ভেবে দেখাে ,আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কি পরিমাণ নিয়ামত ও অনুগ্রহ প্রদান করেছেন।আল্লাহ প্রদত্ব আরেকটি গুণ ক্রোধের প্রতি লক্ষ্য করাে।এর দ্বারা মানুষ শত্রু ,অনিষ্টকারী জন্তু ও ক্ষতিকর দ্রব্য থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়।আবার মানুষকে হিংসাও দান করেছেন ,যা দ্বারা সে স্বীয় স্বার্থ অর্জনে সক্ষম হয়।তবে এই ক্রোধ ও হিংসাবৃত্তি প্রয়ােগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও গণ্ডির প্রতি সতর্ক থাকার নির্দেশ রয়েছে।কেননা এই স্বভাবদ্বয়ের কোন একটির ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম

জ করার অর্থই হলাে শয়তানী স্বভাবে পরিণত হওয়া।ফলে সে আল্লাহর রহমত ও দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যাবে।ক্রোধের বশবর্তী হয়ে মানুষ যখন কোন অন্যায়ের মােকাবেলা করতে অগ্রসর হবে তখন তার পদক্ষেপকে খুবই সতর্ক ও সংযত রাখতে হবে।অন্যথায় পদস্খলন অনিবার্য।অবশ্য এক্ষেত্রে হিংসাবৃত্তি দমন করে ঈর্ষা করতে পারে। কারণ হিংসার অর্থ হলাে ,এক সাথে অন্যের ক্ষতি ও নিজের স্বার্থ কামনা করা এবং ঈর্ষার বেলায় অন্যের সমকক্ষতা বা তদপেক্ষা উন্নতি লাভ কামনা করা হয় ,এক্ষেত্রে অন্যের ক্ষতি বর্তমান থাকে না।মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অশেষ কুদরত ও পরম হিকমতে বান্দাকে কতগুলাে বিশেষ গুণ ও উপকারী বস্তু প্রদান করেছেন,যা মানুষের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর ও লাভজনক।আবার কতগুলাে ক্ষতিকর বস্তু থেকে মানুষকে হেফাজত করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা তার অশেষ মেহেরবানীতে মানুষের মধ্যে আশা-আকাংখা নামক হৃদয়ভিত্তিক একটি বস্তু দান করেছেন,যার ফলে পরিবার-পরিজন ও সাংসারিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং বংশ পরম্পরার ধারাও অব্যাহত রয়েছে।আশা-আকাংখার কল্যাণেই দুর্বল ও গরীব লােকেরা সবল ও ধনী লােকদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারছে। সম্পদশালী লােকেরা শহর ,বন্দর ,নগর ও রাজ্য প্রতিষ্ঠা করছে ,দুনিয়া আবাদ করছে। আর এসব কাজের সূত্রে দরিদ্র লােকেরা পরােক্ষ এবং পুত্যক্ষভাবে লাভবান হচ্ছে। মানুষকে প্রকৃতিগতভাবেই কিছুটা দুর্বল ও পরনির্ভরশীল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।শিল্প - সভ্যতা ,কারিগরী -জ্ঞান ,নির্মাণ কৌশল ইত্যাদি এক দিনেই তৈরী হয়নি।যুগ যুগ ধরে মানুষের চেষ্টা-গবেষণা ও সাধনা অনুশীলনে তা গড়ে উঠেছে এবং পুরুষানুক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে তা চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে।মানুষ যদি পূর্বপুরুষ কর্তৃক নির্মিত বাড়ী -ঘর ,শিল্প - সংস্কৃতি ও সামাজিক,পারিবারিক শৃংখলা না দেখতাে,তাহলে তারা ঘর-বাড়ি,শিল্প-দ্রব্য কিছুই তৈরী করতে পারতাে না,এমনকি সামাজিক ও পারিবারিক সৃংখলা ও সমঝােতার উৎসও তারা খুঁজে পেতে।

কেননা তাদের কাছে এমন কোন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি-জ্ঞান নেই যা দ্বারা তারা জীবন যাপনের এমন সুবিন্যস্ত প্রণালী ও ব্যবস্থা অর্জন করতে পারে।পূর্বপুরুষদের কর্ম - প্রক্রিয়া লালন ও সংরক্ষণ এবং পরিবর্ধন ও উন্নয়ন এ সবকিছুর মূলেই রয়েছে।মানুষের আশা-আকাংখা।আশা-আকাংখার ফলশ্রুতেতেই তাদের কর্মের উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।আবার পরবর্তী বংশধরের জন্য তারা এসব নমুনা রেখে যায়ূ।যার দ্বারা পরবর্তীরাও অসংখ্য সুবিধা ও উপকার লাভ করে।যুগ যুগ ধরে এই ধারা

রহস্য বা নিয়ম অব্যাহতভাবে চলে আসছে। এসবই মানুষের মধ্যে প্রকৃতিগত আশা - আকাংখারই প্রতিফল।কিছু কিছু বিষয় আল্লাহ তায়ালা আবার মানুষের নিকট অজ্ঞাত রেখেছেন।যেমন হায়াত ও মউতের খবর।মানুষ যদি তার সংক্ষিপ্ত আয়ু সম্পর্কে অবগত হতাে,তাহলে তার জীবনের সকল স্বাদ - আহলাদ ও আশা-আকাংখা বিস্বাদে পরিণত হতাে।দুনিয়ার সব কিছুই তার কাছে বিরস মনে হতাে।এমনকি দুনিয়ার কোন কাজ কর্মেই তার মন বসতাে না।ঘর-বাড়ি নির্মাণ,বংশ রক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সে দারুনভাবে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তাে।আর সে যদি জানতাে যে,আয়ু খুব দীর্ঘ তাহলে সে দ্বীন ও আখেরাতের কথা ভুলে গিয়ে দুনিয়া ও প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হতাে এবং সর্বদা নানা দুষ্কর্মে লিপ্ত হতাে।কেননা তার ধারণা থাকতাে যে ,তার মৃত্যু অনেক দূরে ।এভাবে পাপ কাজ করতে করতে এবং দুনিয়ার সাথে নানাভাবে জড়িয়ে গিয়ে সে এক সময় মৃত্যুর কথাই ভুলে যেতাে।

এজন্যই আল্লাহ পাক বিষয়টি সুকৌশলে মানুষের নিকট অজ্ঞাত রেখেছেন।কেহ বলতে পারে না মৃত্যু কখন এসে কাকে গ্রাস করবে।ফলে সর্বদা মৃত্যুর আশংকা তার মনে জাগ্রত থাকে এবং পাপ কাজে লিপ্ত হবার সময় আল্লাহ ও তার শাস্তির কথা মনে হয়। অপর পক্ষে বাঁচার আশায় সে নিজেকে ঘর- বাড়ী ,পরিবার -পরিজন সমাজ -সংসার ইত্যাদির সাথে জড়িত রাখে।যেসব বস্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভােগ-ব্যবহারের জন্য সৃষ্টি করেছেন সেগুলাের প্রতি লক্ষ্য করাে।দেখ ,আল্লাহ তায়ালা এসব অফুরন্ত নিয়ামতের মধ্যে কতাে অসংখ্য রহস্য ও মঙ্গল নিহিত রেখেছেন।খাদ্যদ্রব্যে কতাে ধরনের স্বাদ রয়েছে।একেক ধরনের খাদ্যে একেক ধরনের স্বাদ।ফল-ফলাদির প্রতি লক্ষ্য করাে,রং ও আকৃতিতে একটি আরেকটি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।স্বাদে ও ঘ্রাণেও রয়েছে ভিন্নতা।ফুলগুলির প্রতি খেয়াল কর , কলাে রং-বেরং,মনােমুগ্ধকর ও ঘ্রাণসমৃদ্ধ ফুল রয়েছে এই পৃথিবীতে।এসব দৃষ্টিনন্দন ফুল প্রকৃতিকে করে অপরূপ।ঘর ও মজলিসকে করে সুরভিত ও শােভিত।কিছু ফুল দ্বারা তেল ও আতর তৈরী করা হয়,যা মানুষের হৃদয়কে আমােদিত করে এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে থাকে।পশুগুলাের প্রতি লক্ষ্য করাে ,দেখবে ,তা কত ধরনের এবং মানুষের জন্য কত উপকারী।কিছু পশু বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়,যা অত্যন্ত গতিশীল ও আরামদায়ক।কিছু পশু রয়েছে হালাল , যার গােশত অত্যন্ত সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর।আবার কিছু পশু কৃষি ও সেচ কাজের সাহায্যে আসে।

পাখীগুলাের প্রতি লক্ষ্য করােঃ কতাে জাতের,কতাে রঙ্গের পাখি রয়েছে - তার হিসেব কে রাখে?কিছু পাখি রয়েছে যা হালাল।তার গােশত যেমন সুস্বাদু তেমনই উপকারী।কিছু পাখি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে ,প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং অলস দুপুরে কিংবা বিষন্ন সময়ে তাদের সুরেলা গুঞ্জন মানুষের মনকে ব্যাকুল করে তুলে।

উদ্ভিদ ও তৃণলতাগুলাের প্রতি লক্ষ্য করােঃ এগুলাের ভিতর আল্লাহ তায়ালা রােগ - ব্যাধিসহ নানা গুণ নিহিত রেখেছেন।আকার -আকৃতি ,ক্রিয়া -প্রতিক্রিয়া ও ব্যবহারে এগুলাের বিভিন্নতা লক্ষণীয়।আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিবেক - বুদ্ধি দিয়েছেন।তাই সে প্রাকৃতিক বস্তুর উপকারিতা ও ব্যবহার উদ্ভাবন করে তা নিজের কাজে লাগাচ্ছে এবং তার সুফল ভােগ করছে।

আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত হেকমত ও সৃষ্টি কুশলতার প্রতি খেয়াল করােঃ তিনি প্রকৃতির ভাণ্ডারে কত সম্পদ ও রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন,যা চিন্তা করতে গেলে বিস্ময়ে হতভম্ব ও অভিভূত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।মানুষের চাহিদা ও প্রয়ােজন অনুসারে বিভিন্ন ব্যক্তি প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে থাকে। এই বিভিন্নতার কারণেই ধনী ও দরিদ্রের সৃষ্টি।ধনী -দরিদ্রের মাঝে পার্থক্যের এটাই কারণ।আর এই সূত্র ধরেই শিল্প সভ্যতার গতি চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে চলে। সৃষ্টিজগতে আল্লাহ তায়ালা যত অসংখ্য নিয়ামত সৃষ্টি করেছেন তার চূড়ান্ত রহস্য উদঘাটন ও বর্ণনা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।সৃষ্টির পরিপুর্ণ রহস্য ও হিকমত সেই মহান স্রষ্টাই জানেন যার সৃষ্টি কুশলতায় এই সৃষ্টিজগত রূপ পেয়েছে,যিনি সর্বজ্ঞানী,যার অনুগ্রহ সর্বব্যাপী ব্যাপ্ত।