একজন মুসলমান কেনো কলব পরিস্কার রাখবে

 


মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন মানুষকে তাঁর এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন ।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ এরশাদ করেছেন

K. وما خلقت الجن والإنس إلا ليعبدون

আমি জিন এবং মানুষকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি '

মানুষকে সৃষ্টি করে সুন্দর অবয়ব দান করেছেন । মানুষকে দিয়েছেন হাত পা , মুখমণ্ডল , কপাল , মাথা আরও অনেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ । এই অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলোর মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন কার্যাবলী সম্পাদন করে । এছাড়াও মানুষকে এমন একটি জিনিস দান করেছেন যা হলো মানুষের অন্তর বা ক্বলব । ক্বলব বা অন্তর সুব্ধ হলে তার সকল কাজ কর্ম , চাল - চলন , আচার - আচরণ আমল - আখলাক্ব সব কিছু ঠিক হয়ে যায় । কারণ মানুষের সকল আমল সম্পাদিত হয় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা । মানুষের অন্তরের চিন্তা শক্তি এতই বিশাল , যা হলো সাগর , মহা সাগর , আকাশ মহাকাশের চেয়েও অনেক দীর্ঘ । কারণ মানুষ তার কল্পনা শক্তি দিয়ে এত বিশাল দুরত্বে চলে যেতে পারে যা পরিমাপ করা সম্ভব নয় । শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্বলবের অধীন , ক্বলব যা করতে চাইবে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা তাই বাস্তবায়িত হয়ে থাকবে । সুতরাং প্রত্যেকটি মানুষকেই এই ক্বলব নামক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটির অবস্থান , এর পরিচয় , একে পরিচ্ছন্ন করার উপায় ও প্রয়োজনীয়তা , ক্বলবের চিকিৎসা এবং কি ধরনের ডাক্তার দিয়ে এই ক্বলবের চিকিৎসা করা যাবে , সব শেষে এই ক্বলব বা অন্তর সংশোধনের পদ্ধতি আবশ্যক ।

ক্বলবের অবস্থান ও পরিচয়ঃ প্রত্যেকটি মানুষের বুকের মাঝে বাম স্তনের দুই আঙ্গুল নীচে ক্বলবের অবস্থান ।

হাদীস শরীফে আল্লাহ তায়ালার হাবীব বলেছেন 

عن النعمان بن بشير رضي الله عنـه قـال قـال رسـول اللہ صلى الله عليـه وسـلم ألا إن في الجسد مضغة إذا صلحت صلح الجسد كله وإذا فسدت فسد الجسد كله ألا وهي القلب .

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী সর্ব কালের সর্ব যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহা মানব হযরত মুহাম্মদ ( সা . ) ইরশাদ করেন , সাবধান ! জেনে রেখ , নিশ্চয়ই শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে । এটা যদি ঠিক হয়ে যায় তবে সমস্ত আমল আখলাক্ব ঠিক হয়ে যায় , আর এটা নষ্ট হয়ে গেলে সমস্ত শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ সকল আমল আখলাকু নষ্ট হয়ে যায় , জেনে রেখ ! এই টুকুরোটার নামই হল ক্বলব । ( বুখারী , মুসলিম , নাসায়ী , তিরমীজি )

উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে , প্রত্যেকটি কাজ বা আমল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে ক্বলব । তাই অবশ্যই এই ক্বলবকে সার্বক্ষণিক সুস্থ্য , সবল রাখার জন্য প্রত্যেক মুমিনকে সাবধান থাকতে হবে । যেন কোন ক্রমেই এই ক্বলব থেকে কোন ভুল সিদ্ধান্ত , ভুল কাজ , কামনা , বাসনা সৃষ্টি না হয় যা বাস্তবায়িত হলে আমরা চিরশান্তির জান্নাতের পথ থেকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত হব ।


আল্লাহ রব্বুল আলামীন ফরমান

فإنها لا تعتى الأبصار ولكن تعمى القلوب التي في الصدور

বস্তুত চক্ষু অন্ধ হয় না , কিন্তু ঐ ক্বলব অন্ধ হয় যা বুক বা সিনার মধ্যে ।


আল্লাহ রব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেন

ياأيها الذين آمنوا اتقوا الله حق تقاته ولا تموتن إلا وأنتم مسلمون .

হে ইমানদারগণ , তোমরা আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে ভয় করো ভয় করার মত এবং পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না । "

এ আয়াতে কারীমা দ্বারা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় । যে , যিনি ঈমান এনেছেন , তিনি তো মুমিন কিন্তু তার পরেও তার প্রকৃত দায়িত্ব হচ্ছে যে , ঈমান আনার পরেও আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দি লাভের জন্য অবশ্যই তাকে আল্লাহ তায়ালার হুকুম তথা ঈমানী দায়িত্বগুলো যথাযথ ভাবে পালনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়ার মর্যাদা অর্জন করা । আর পরিপূর্ণ মুসলমান হতে হলেই তাকে আত্মশুদ্ধি তথা ক্বলব থেকে সমস্ত ময়লা দূর করে ইসলাহী কুলব তৈরী করে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা , যার ফলশ্রুতিতে মুমিন পরিণত হয় একজন পরিপূর্ণ মুসলমান হিসাবে , আল্লাহওয়ালা হিসাবে , আল্লাহর অলী তথা আল্লাহর মক্ববুল বান্দা হিসেবে ।

আল্লাহর হাবীব বলেছেন

لكل شئ صقالة وصقالة القلوب ذكر الله .

প্রত্যেকটি জিনিস পরিষ্কার করার যন্ত্র রয়েছে , আর ক্বলব বা অন্তর পরিষ্কারের যন্ত্র হালো আল্লাহ তায়ালার জিকির ।

উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে , রব্বুল আলামীনের জিকির যদি আমরা বেশী বেশী করতে পারি তাহলে আমাদের অন্তর তথা ক্বলবের ব্যধি দূর হবে । আর ময়লা মুক্ত , ব্যধি মুক্ত তাক্বওয়া সম্পন্ন ক্বলব যদি আমরা তৈরি করতে পারি তাহলেই আমরা আল্লাহ ওয়ালা বান্দায় পরিণত হতে পারবো ।

আল্লাহ পাক কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন

H قد أفلح من زكاها- وقد خاب من دساها .

“ তারাই সফল কাম , যারা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে । আর তারাই ব্যর্থ যারা আত্মাকে কলুষিত করেছে ।

উপরোক্ত আয়াতে কারীমা تزكية النفس বা আত্মশুদ্ধির উপর আল্লাহ রাদুল আলামীন গুরুত্বারোপ করেছেন । পবিত্র কুরআনুল কারীমে ৩০ নং পারায় সুরা আল শামস এর মধ্যে রব্বুল আলামীন উপরোক্ত দুটি আয়াতের পূর্বের আয়াত গুলোতে ১১ বার কসম করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা কোন কথা বলতে গিয়ে ৩ টি অথবা টির বেশী কসম করেন নি । কিন্তু আত্মশুদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে এগারটি কসম করেছেন । এতেই বুঝা যায় যে- تزكية النفس বা আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অনেক বেশী । কারণ ক্বলব যদি পরিষ্কার হয়ে যায় তখন মুমিনের সমস্ত আমল গুলি শুদ্ধ হয়ে যায় ।

ক্বলব বা অন্তর পরিষ্কারের উপায়ঃ কঠিন রোগ হলে যেমন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হয় , শুধু ঔষদের দোকান দিয়ে ঔষধ কিনলেই হয়না । ঠিক তেমনি ক্বলবের চিকিৎসার জন্য আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় । হক্কানী পীরের হাতে বায়াত হতে হয় ।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান

ياأيها الذين آمنوا اتقوا الله وابتغوا إليه الوسيلة 

হে ঈমানদারগণ , আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো এবং আল্লাহ ওয়ালা হওয়ার জন্য অসীলা তালাশ করো।

আল্লাহ প্রাপ্তির জন্য পরিশেষে আমরা বলতে পরি যে , ক্বলবের চিকিৎসার জন্য একজন হক্কানী পীরের হাতে বায়াত হয়ে , তার দেয়া সবকাদি নিয়ম মাফিক অনুসরণ করে ইবাদত বন্দেগীতে আমরা আত্মনিয়োগ করতে পারলেই , ক্বলবের সমস্ত রোগ দূর হয়ে ক্বলব সংশোধন হয়ে , ক্বলবে সালিম হাসিল হবে আমরা কামিয়াব হতে পারেবো ।

আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন বলেন

ياأيها الذين آمنوا اتقوا الله وكونوا مع الصادقين .

“ হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদী লোকেদের সোহবাত অবলম্বন কর । ” অতএব , পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হতে মা'রেফাত অর্জন করা এবং ক্বলব সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজনীয় । তাতে সন্দেহের অবকাশ নাই।