কাযা নামাজ পড়ার নিয়ম, সময় ও কিছু জরুরী মাসয়ালা



কাযা নামাজ কি

বিভিন্ন কারণে আমাদের নামাজ ছুটে যায় বা সময় মত নামাজ কায়েম করতে পারি না। নির্ধারিত ওয়াক্তে ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে না পারলে, সময় চলে যাওয়ার পর তা পড়াকে ‘কাজা’ আদায় বলা হয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করা ভুলে যায়, যখনই তার মনে পড়বে তখনই যেন সে সালাত আদায় করে নেয়।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন করেন, ‘নামাজ মুমিনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩) 


কাযা নামাজের সময়

পূর্ববর্তী ওয়াক্তের নামাজ ‘কাজা’ আদায়ের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। নামাজের ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর যখনই নামাজের কথা স্মরণ হবে তখনই পড়ে নেয়া উত্তম। যেমন ধরুন- যদি কেউ ঘুমের কারণে ফজরের নামাজ আদায় না করতে পারে; তবে সে ঘুম থেকে যখনই উঠবে, তখনই নামাজ আদায় করবে। তবে নিষিদ্ধ সময়গুলোতে মনে পড়লে অপেক্ষা করতে হবে। তবে উত্তম হলো যেই ওয়াক্তের নামাজ ঐ ওয়াক্তে আদায় করা। অর্থাৎ ঐ ওয়াক্তের ফরজ আদায়ের আগে কাযা আদায় করে নেওয়া।

প্রিয়নবী (সা:) বলেছেন, ‘ইসলাম এবং কুফরির মধ্যে পার্থক্যকারী হচ্ছে নামাজ।’ তাইতো তিনি আরও বলেছেন, ‘ইচ্ছাকৃত ভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়া কুফরি।’নামাজ পড়ার হুকুম হলো নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা।

জুমআ’র নামাজের কাজা নেই; যদি কেউ জুমআ’র নামাজ কোনো কারণে আদায় করতে না পারে তবে জুমার নামাজের পরিবর্তে ঐ ওয়াক্তে সম্ভব হলে জোহরের ৪ রাকাআত নামাজ পড়ে নিবে।

২৪ ঘণ্টায় কিছু সময় এমন আছে যখন নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। হাদীস সূত্রে জানা যায়, তিন সময়ে নামাজ পড়া নিষেধ। সাহাবী উকবা বিন আমের জুহানী (রা.) বলেন, ‘তিনটি সময়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নামাজ পড়তে এবং মৃতের দাফন করতে নিষেধ করতেন।


১. সূর্য উদয়ের সময়; যতোক্ষণ না তা পুরোপুরি উঁচু হয়ে যায়।

২. সূর্য মধ্যাকাশে অবস্থানের সময় থেকে নিয়ে তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত।

৩. যখন সূর্য অস্ত যায়’। [সুবুলুস সালাম : ১/১১১, সহীহ মুসলিম : ১/৫৬৮]

নামাজের নিষিদ্ধ সময়

 নিষিদ্ধ সময় তিনটি।

১. সূর্য যখন উদিত হতে থাকে এবং যতোক্ষণ না তার হলুদ রঙ ভালোভাবে চলে যায় ও আলো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরজন্য আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট সময় প্রয়োজন হয়।

২. ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়; যতোক্ষণ না তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে

৩. সূর্য হলুদবর্ণ ধারণ করার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

উল্লিখিত তিন সময়ে সব ধরনের নামাজ পড়া নিষেধ। চাই তা ফরজ হোক কিংবা নফল। ওয়াজিব হোক বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ সময়ে শুকরিয়ার সিজদা এবং অন্য সময়ে পাঠকৃত তিলাওয়াতের সিজদাও নিষিদ্ধ।


কাযা নামাজ সম্পর্কিত কিছু মাসয়ালা


১। যদি পিতা পুত্রকে বলে- আমার নামায রোযা ফওত হইয়াছে , উহার কাজা আদায় করিয়া দিবে , তবে আমাদের মাযহাবে পুত্রের উহা আদায় করা জায়েয নাই । ( তাহতাবী )

২। কোন কারণে নামায না পড়িয়া থাকে তাহা হইলে ঐ নামায কাজা আদায় করিতে হইবে । এক ওয়াক্ত হউক বা তার চেয়ে বেশী ওয়াক্ত হউক । ( আলমগীরী )

৩। সুস্থ অবস্থায় নামায ফণ্ডত হইয়া থাকিলে মাজনুন অর্থাৎ পাগল হইয়া পড়িলে ঐ নামায কাজা আদায় করিতে হইবে না , যেরূপ মাজনুন অবস্থায় নামায ফওত হইয়া থাকিলে ভাল হইলেও ঐ নামাযের কাজা আদায় করিতে হয় না ।

৪। যদি কেহ কাফের হইয়া যায় ও পুনঃ মুসলমান হয় তাহা হইলে কুফরী অবস্থায় ফওত নামাযের কাজা পড়িতে হইবে না ।

৫। যদি কেহ দারুল হরবে মুসলমান হয় ও নামায পড়া যে ফরজ , তাহা না জানার দরুন নামায কাজা করিয়া থাকে , তাহা হইলে দারুল ইসলামে আসিয়া ঐ নামাযের কাজা আদায় করিতে হইবে না ।

৬। যদি কেহ বেহুঁশ থাকার দরুন কিংবা এরূপ রোগাক্রান্ত হয় যে , ইশারায়ও নামায আদায় করিতে অক্ষম হইয়া পড়ে ও এমতাবস্থায় একদিন এক রাত্রের বেশী নামায কাজা হইয়া যায় , তাহা হইলে সে ব্যক্তির হুঁশ হওয়ার পর বা রোগ আরোগ্যের পর ঐ নামায কাজা আদায় করিতে হইবে না । বিনা ওজরে নামায কাজা করিয়া থাকিলে উহা পুনঃ আদায় করিতে হয় । কিন্তু ওজর অবস্থায় এই হুকুম পরিবর্তন হয় । যেমন মুকীম অবস্থায় চার রাকয়াত বিশিষ্ট ফরজ নামায ফণ্ডত হইয়া থাকিলে মুসাফিরিতে গেলেও ঐ চারি রাকয়াত কাজা আদায় করিতে হয় । কিন্তু মুসাফিরি অবস্থায় কাজা হইয়া থাকিলে মুকীম অবস্থায় চারি রাকয়াতের স্থলে দুই রাকয়াত কাজা আদায় করিতে হয় । ফরজের কাজা আদায় করা ফরজ ; ওয়াজিবের কাজা ওয়াজিব ; সুন্নাতের কাজা সুন্নাত । কাজা আদায়ের জন্য কোন ওয়াক্ত ঠিক করা হয় নাই । মাকরূহ ওয়াক্ত ব্যতীত চির জীবনই কাজা আদায়ের সময় ।

৭। কাফী কিতাবে আছে- যদি কেহ নামায পড়িয়া কাফের হয় ও পুনঃ ঐ ওয়াক্তের মধ্যেই মুসলমান হয় , তাহা হইলে ঐ নামায পুনঃ পড়িতে হইবে । ( আলমগীরী )

৮। যদি কোন বালক এশার নামায পড়িয়া নিদ্রা যায় ও নিদ্রাযোগে এহ্‌তেলাম ( স্বপ্নদোষ ) হয় , তাহা হইলে এশার নামায কাজা আদায় করিতে হইবে । কিন্তু বালিকা যদি এশা পড়িয়া ঘুমায় ও ঘুমের মধ্যে হায়েজ হয় , তাহা হইলে রাত্রে উহা জানিতে পারিলেও এশা কাজা পড়িতে হইবে না । অবশ্য যদি বালিকা বয়সের হিসাবে বালেগা হইয়া থাকে তাহা হইলে উক্ত অবস্থায় এশার নামায কাজা আদায় করিবে ।

৯। যে নামাযে স্বশব্দে কিরাত পড়িতে হয় এরূপ নামায কাজা হইলে কাজা আদায়কালে জেহের অর্থাৎ স্বশব্দে কিরাত পড়া উত্তম । কিন্তু খফি নামায অর্থাৎ যে নামাযে চুপে চুপে কিরাত পড়িতে হয় সেই নামায ফণ্ডত হইলে কাজা আদায়কালে চুপে কিরাত পড়া ওয়াজিব ।

১০। নফল নামায আরম্ভ করার পর যদি কাজা নামাযের কথা মনে পড়ে , তাহা হইলে নফল নামায নষ্ট হইবে না । কারণ ফরজ নামাযের জন্য তারতীব রক্ষা করা ওয়াজিব কিন্তু নফলের জন্য নহে ।

১১। ফওত নামায ও বর্তমান ওয়াক্তের নামাযে যেরূপ তারতীব ঠিক রাখা ওয়াজিব , তদ্রূপ কাজা নামাযের তারতীব ঠিক রাখাও ওয়াজিব । যেমন - ফজরের নামায ফওত হইয়া থাকিলে জোহর পড়িবার পূর্বেই ফজরের কাজা আদায় করিয়া লইতে হয় অথবা বেতের কাজা হইয়া থাকিলে ফজরের নামাযের পূর্বেই কাজা আদায় করা ওয়াজিব । ইমাম আবূ হানীফা রাহেমাহুল্লাহর মতে কাজা নামায আদায়কালে তারতীব রক্ষা না করিলে নামায ফাসেদ হইবে । প্রকাশ থাকে যে , ছয় ওয়াক্তের বেশী নামায ফণ্ডত হইয়া থাকিলে কাজা আদায়কালে তারতীবের খেয়াল না রাখিলেও চলিবে ।

১২। ইমামের সঙ্গে এক্তেদা করিয়া ঘুমাইয়া গেলে বা অজু ছুটিয়া গেলে পুনঃ অজু করিয়া আসিয়া ইমামের সঙ্গে শামিল হইয়া ইমামের তাবেদারী করিবে ও বাকী নামায আদায় করিবে । এই কওলের উপর তিন ইমামের একই মত । কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা রাহেমাহুল্লাহর মতে জুম্‌স্আর নামাযের ইমামের এক্তেদা করিয়া লোকাধিক্য বশতঃ সিজদাহ করিতে না পারিয়া দাড়াইয়া থাকিলে ইমামের সালাম ফিরাইবার পর ঐ নামায আদায় করিবে ।

১৩। যদি আছরের নামাযের পর মনে হয় যে জোহরের নামায পড়া হয় নাই , তাহা হইলে তারতীবের প্রতি খেয়াল না রাখিলেও চলিবে । কারণ ভুলে এরূপ ঘটিয়াছে । যদি অজু আছে মনে করিয়া জোহরের নামায পড়ার পরে নূতন অজু করিয়া আছরের নামায আদায় করার পর স্মরণ হয় যে , জোহরের নামায বিনা অজুতে পড়া হইয়াছে তবে এমতাবস্থায় শুধু জোহরের নামায পড়িলেই চলিবে । ইহাতেও তারতীব ঠিক রাখিতে হইবে না । কেননা এই বিষয়টি ভুল না হইলেও ভুলের হুকুম রাখে । কিন্তু হজ্জের মওসুমে আরাফাতে যে জোহর আছর একত্রে পড়িতে হয় তাহাতে ঐরূপ ভুল হইলে তারতীব রক্ষা করিতে হইবে । যেহেতু ঐ তারিখে জোহর ও আছর আরাফাতে একত্রে পড়া বিধান বলিয়া ঐ হুকুম । ( আলমগীরী )

১৪। ফজরের নামায ফওত হইয়াছে এই কথা মনে থাকা সত্ত্বেও জোহর আদায় করিয়া আছরের নামায পড়িলে , আছরের নামায ফাছেদ হইবে না । কারণ , তাহার ধারণা ছিল জোহরের নামায পড়িয়াছে । এমতস্থলে ফজরের কাজা আদায় করিতে হইবে । কিন্তু তারতীব রক্ষা করিতে হইবে না ।

১৫। ফজরের নামায ফওত থাকা সত্ত্বেও জোহর পড়িবার সময় সন্দেহ হইল আমি ফজর পড়িয়াছি কিনা , কিন্তু জোহর আদায় করার পর সন্দেহ দূর হইল যে , প্রকৃত পক্ষে ফজরের নামায পড়ি নাই । এমতস্থলে তারতীব অনুযায়ী ফজরের কাজা ও জোহর আদায় করিতে হইবে । ( আলমগীরী )