কসর নামাজ কি? কিভাবে পড়বে, কত রাকাত পড়বে, কোন কোন নামাজের কসর করবে,নামাজের নিয়ত ও নিয়ম বিস্তারিত আলোচনা


সালাতুল কসর কি

কসর আরবি শব্দ আর এর অর্থ হলো কম করা, কমানো। চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ কমিয়ে দুরাকাত পড়া হয় বলে একে কসর বলে ৷

মুসাফির ব্যক্তি চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ দু রাকাত পড়াকেই কসর নামাজ বলে ৷ এটা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ৷ কাঠিন্য আরোপ তাঁর মাকসাদ নয় ৷ তাই সফর বা ভ্রমণের ক্লান্তির দিকে লক্ষ্য করে ফরজ চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজ যেগুলো হলো জোহর, আসর ও ইশার সালাতকে সংক্ষিপ্ত করে দু রাকাত ফরজ করেছেন ৷
আগে জানতে হবে মুসাফির কে।
মুসাফির শব্দের অর্থ সফরকারী বা ভ্রমণকারী ৷ তবে সাধারণ ভ্রমণ করলেই মুসাফির হবে না।

কসর নামাজের শর্ত

কসর নামাজ পড়ার জন্য শর্ত হল, মুসাফির হওয়া। ৪৮ মাইল (৭৭.২৪৬৪কিলোমিটার) বা এর বেশি সফর করার নিয়তে কেউ যদি নিজ গ্রাম বা শহরের সীমানা অতিক্রম করে তবে সে তখন থেকে মুসাফির গণ্য হবে এবং নামায কসর করবে। অর্থাৎ যোহর, আসর ও ইশার ফরয নামায দুই রাকাত করে আদায় করবে।
কসর নামাজ সম্পর্কে নবিজীর হাদীস,
ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
يَا أَهْلَ مَكَّةَ ، لا تَقْصُرُوا الصَّلاةَ فِي أَدْنَى مِنْ أَرْبَعَةِ بُرُدٍ
অর্থঃ হে মক্কাবাসী! চার বারীদের কমে কসর করবে না। (দারা কুতনী ১/৩৮৭)
ইমাম বুখারি রহ. বলেন,
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ، وَابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ، يَقْصُرَانِ، وَيُفْطِرَانِ فِي أَرْبَعَةِ بُرُدٍ وَهِيَ سِتَّةَ عَشَرَ فَرْسَخًا
অর্থঃ ইবনে উমর (রাঃ) এবং  ইবনে আব্বাস (রাঃ) চার বারীদ সফরের সময় কসর পড়া এবং রোযা ভাঙ্গার কথা বলেছেন। আর সেটি হল, ১৬ ফরসখ। (সহিহ বুখারি, নামায কসর করা অধ্যায়)
এখানে এক ফরসখ তিন মাইল হয়ে থাকে। সুতরাং প্রত্যেক বারীদ হয় ১২ মাইল। আর চার বারীদকে ১২ দিয়ে গুণ দিলে কিংবা ষোল ফরসখকে তিন দিয়ে গুণ দিলে হয় ৪৮ মাইল। অতএব, সফরের দূরত্ব দাঁড়াচ্ছে ৪৮ মাইল। ( কামুসুল ফিকহ ২/৩১৪ আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু ১/৭৫)

কসর নামাজ পড়ার নিয়ম

মুসাফির ব্যক্তি যাত্রাপথে চার রাকাআত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ (জোহর,আসর ও ইশার ফরজ নামাজ) কে দুই রাকাত পড়বে। মাগরিব ও ফজরের নামাজ পুরোই পড়বে কারন এই দুই ওয়াক্ত নামাজের ফরজ ৪ রাকাত ৷
আর গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পর সেখানে ১৫ দিন বা তদুর্ধকাল থাকার নিয়ত করে তখন নামাজ পূর্ণ পড়তে হবে। সেখানে কসর করা জায়েজ নয় ৷
আর যদি ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত থাকে তাহলে কসর হবে। গন্তব্যস্থান নিজের বাড়ি হলে কসর হবে না, চাই যে কয় দিনই থাকার নিয়ত করুক।
মুসাফিরের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করে পড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রিয় বান্দাদের জন্য উপহার স্বরূপ। তাই মুসাফিরের জন্য ওয়াজিব হলো সেই উপহার গ্রহণ করা।
কসর করা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বিষয় ৷
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا
অর্থ: তোমরা যখন যমীনে সফর কর এবং তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, কাফিরগণ তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, তখন সালাত কছর করলে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। নিশ্চয়ই কাফিরগণ তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। [সূরা নিসা, ১০১]
শত্রুদের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলেও সফরে সালাত ‘কসর’ করা যাবে। কেননা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সফরেই সালাত ‘কসর’ করেছেন।
(إِنْ خِفْتُمْ)
“যদি তোমাদের ভয় হয়”। এ কথা অবস্থার দিকে লক্ষ করে বলা হয়েছে। কেননা তখন সারা আরব-ভূমি যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কোন অবস্থাতেই সফর বিপদ মুক্ত ছিল না। কুরআনের এরূপ অনেক বিধান অধিকাংশ অবস্থার দিকে লক্ষ করে নাযিল হয়েছে।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(لَا تَاْكُلُوا الرِّبَا اَضَعَافًأ مُّضَاعَفًا)
তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। তার মানে কি এই- চক্রবৃদ্ধি না হলে সুদ খাওয়া যাবে? না বরং তখন আরবরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেত, তাই এভাবে বলা হয়েছে।
অনুরূপ:
(تُكْرِهُوْا فَتَيٰتِكُمْ عَلَي الْبِغَا۬ءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا)
তোমাদের দাসীগণ সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য কর না”(সূরা নূর ২৪:৩৩)
এর অর্থ কি এই যে, তারা ব্যভিচার করতে চাইলে অনুমতি দিয়ে দাও। বরং তারা সতিত্ব রক্ষা করতে চাইতো তাই আল্লাহ তা‘আলা এ কথা বলেছেন। তাই ভয় না থাকলেও যে কোন বৈধ সফরে সালাত কসর করা যাবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
কসর নামাজ আদায় করার নিয়ম
ইয়ালা বিন উমাইয়া (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: উমার (রাঃ)‎-কে জিজ্ঞেস করলাম আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
(فَلَیْسَ عَلَیْکُمْ جُنَاحٌ اَنْ تَقْصُرُوْا مِنَ الصَّلٰوةِﺣ اِنْ خِفْتُمْ)
‘যদি তোমাদের আশঙ্কা হয়, কাফিররা তোমাদের জন্য ফেতনা সৃষ্টি করবে, তবে সালাত সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোন দোষ নেই’ এখন কি আল্লাহ তা‘আলা মানুষদের নিরাপত্তা দেননি? (তাহলে কসর করতে হবে কেন?)
অনেক হাদীসে এসেছে, মুহাম্মাদ (সা.) হজ্জ,ওমরা, যুদ্ধসহ যে কোন সফরে কছরের নামায পড়তেন। ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত: “আমি মুহাম্মাদ (সা.) এর সাথে ছিলাম, তিনি সফরে (চার রাকাআত বিশিষ্ট নামায) দুই রাকাআতের বেশি পড়তেন না। আবুবকর ও ওমর একই রকম নামায পড়তেন।”
-বুখারী ও মুসলিম।
বিমান, গাড়ি, স্টিমার, ট্রেন, উট, পর্বতারোহণ ও পদব্রজ ভ্রমণের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সবগুলোই সফর বা ভ্রমণের আওতাভুক্ত। সব সফরেই নামায কছর করতে হবে।

কসর নামাজের মাসআলা

১. কসর শুধু চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজেই হয়ে থাকে। যেমন- জোহর, আসর ও এশার নামাজ চার রাকাতের পরিবর্তে দুই রাকাত পড়বেন।
অতএব, মাগরিব, ফজর এবং সুন্নত ও বিতরের নামাজে কোনো কসর নেই।
২. মুসাফির ইমামতি করলে মুক্তাদিদের আগেই বলে দেবে যে সে মুসাফির এবং দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাবে আর মুকিম নামাজিরা দাঁড়িয়ে বাকি দুই রাকাত আদায় করে নেবে।
৩. মুসাফির ব্যক্তি যদি মুকিম ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে, তাহলে ইমামের অনুসরণে সেও চার রাকাত পড়বে।
৪. মুসাফির অবস্থায় যদি কোনো নামাজ কাজা হয়ে যায়, আর তা বাড়ি ফিরে পড়েন তাহলে কসরই পড়বেন এবং বাড়ি থাকা অবস্থায় কোনো কাজা নামাজ যদি সফরে আদায় করেন তবে তা পূর্ণ নামাজই পড়তে হবে।
৫. প্রত্যেক নামাজের নিয়ত করতে হবে, কোন ওয়াক্তের কসর পড়বেন।
৬. মুসাফির ব্যক্তির ব্যস্ততা থাকলে ফজরের সুন্নত ব্যতীত অন্যান্য সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেবেন। তবে ব্যস্ততা না থাকলে সুন্নত পড়া উত্তম।
৭. ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত হয়নি এবং আগেই চলে যাবে চলে যাবে করেও যাওয়া হচ্ছে না, এভাবে ১৫ দিন বা তার বেশি দিন থাকলেও কসর পড়বেন।
৮. দুই রাকাত, তিন রাকাত ফরজ এবং ওয়াজিব নামাজ যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।
৯. চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজ দুই রাকাত পড়ার কথা মুসাফিরের ৷ কিন্তু সে যদি চার রাকাত পড়ে ফেলে ভুলে আর চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজে প্রথম বৈঠকে (দ্বিতীয় রাকাতের পর যে বৈঠক হয়) দরুদ শরিফের ‘ওয়ালা আলী মুহাম্মদ’ পর্যন্ত পড়ে ফেললে নামাজের শেষে সেজদায়ে সাহু করতে হবে। তখন দু রাকাত ফরজ আর দু রাকাত নফল হবে ৷ কিন্তু দ্বিতীয় রাকাতে না বসলে তার নামাজই হবে না ৷ সাহু সিজদা তখন কাজে আসবে না ৷ কেননা দ্বিতীয় রাকাতের বৈঠকটি তার জন্য ফরজ ছিলো ৷ যেটা তার আখেরি বৈঠক ৷
১০. মুসাফির ভুলবশত চার রাকাত নামাজ পড়ে ফেললে যদি দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদের বৈঠক করে থাকে, তবে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় নয়।
১১. পূর্ণ নামাজের স্থলে অর্ধেক পড়ার মধ্যে কারো কারো মনে এরূপ ধারণা আনাগোনা করে যে বোধ হয় এতে নামাজ পূর্ণ হলো না, এটা ঠিক নয়। কারণ কসরও শরিয়তের নির্দেশ। এ নির্দেশ পালনে গুনাহ হয় না, বরং সওয়াব হয়।