শবে কদরের ফজীলত ও করনীয়, কোরআন ও হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা

 

 

কদরের রাত

কদর শব্দের দুইটি অর্থ আছে। একটি হচ্ছে, ভাগ্য বা তাকদীর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেনঃ

انا  انزلنه في ليلة مباركة انا كنا منذرین - فيها  يفرق كل امر حكيم - (الد خان -:٣؛٤)

অর্থ : ‘আমি এই কোরআনকে এক বরকতময় ও মর্যাদাসম্পন্ন রাত্রে নাযিল করেছি। কারণ আমি লােকদেরকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম। এই রাতে সকল বিজ্ঞ ও হেকমতপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।' (সূরা আদ দুখান  ঃ৩-৪)

এই আয়াতে রাত বলতে কদরের রাত বুঝানাে হয়েছে এবং তাতে আগামী ১বছরের অধিক রিজিক এবং হায়াত ও মৃত্যুসহ সকল কিছুর ফয়সালা ও পরিকল্পনা ফেরেশতাদেরকে জানিয়ে দিয়ে মানুষের ভাগ্য ও তাকদীর সম্পর্কে বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিস্তারিত দায়িত্ব অর্পণ করার কথা বলা হয়েছে।

২য় অর্থ হচ্ছে, মর্যাদা ও সম্মানের রাত্রি। এই রাতের ইবাদতের সওয়াব ও পুরস্কার অনেক বেশী। এই রাত্রের ইবাদতকে হাজার মাসের চাইতেও উত্তম বলা হয়েছে। হাজার মাস হচ্ছে ৮৩ বছর ১০ দিনের সমান।

“কি সৌভাগ্যের বিষয় যে এক রাত একজন মানুষের গােটা জীবনের সমান! অর্থাৎ একজন লােক বড় জোর ৮০/৯০ বছর জীবন লাভ করতে পারে। কদরের এক রাতের ইবাদত তার গােটা জিন্দেগীর ইবাদতের সমান। তাই এ রাতের ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্বারােপ প্রয়ােজন।

আল্লাহ কোরআনে বলেছেনঃ “আমি কদরের রাতে এই কোরআনকে নাযিল করেছি। তুমি কি জান কদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চাইতে উত্তম। এই রাতে আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতা ও জিবরীল (আঃ) দুনিয়ায় সকল কল্যাণকর জিনিস নিয়ে অবতীর্ণ হয় এবং সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সারা রাত ব্যাপী শান্তি ও রহমত বিদ্যমান থাকে।' (সূরা কদর)

রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগের উম্মাহর এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারেন যে, সে ১ হাজার বছর পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় তালােয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেছে। তিনি নিজ উম্মাহর বয়সের স্বল্পতা অনুভব করায় এই সূরাটি নাযিল হয়। এখানে কদরের রাতকে হাজার মাসের ইবাদতের চাইতেও উত্তম বলা হয়েছে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ হাজার' শব্দটিকে কেন নির্দিষ্ট করলেন? এটা দ্বারা কি হুবহু হাজার মাস বুঝানাে হয়েছে না তা কোন প্রতীকী শব্দ। এর জওয়াবে বলা যায় , এটি প্রতীকী শব্দ। আল্লাহ আরব জাতির জ্ঞানের পরিধি মােতাবেক বক্তব্য পেশ করেছেন। আরবরা ‘হাজার'কে সর্বশেষ ও সর্বাধিক সংখ্যা মনে করত। তারা বর্তমান যুগের মিলিয়ন ও বিলিয়নের সাথে পরিচিত ছিল না। তাই তারা হাজার সংখ্যাকে শীর্ষ সংখ্যা বিবেচনা করতাে। এই প্রেক্ষিতে, কদরের রাত সংখ্যার মাপকাঠিতে সর্বোচ্চ সংখ্যার চাইতেও উত্তম। তাহলে, এর সঠিক অর্থ দাঁড়ায়, কদরের রাত সকল সময় ও কাল থেকে উত্তম এবং সেই সময় বা কাল যত দীর্ঘই হউক না কেন। 

আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : কদরের রাতে পৃথিবীতে ফেরেশতার সংখ্যা পাথর কণার চাইতেও বেশী হয়ে থাকে। ফলে জমীনে শয়তানের রাজত্ব বাতিল হয়ে যায় এবং সেই রাতে লােকেরা শয়তানের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে।'

কদরের রাতে কোরআন নাযিল হয়েছে। কিন্তু এ সূরায় এটি বছরের কোন মাসে তা বলা হয়নি। এটি কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ রমাযান মাসেই কোরআন নাযিল করা হয়েছে, তাতে রয়েছে মানুষের হেদায়াত এবং এর সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণ। এটি হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী।   (সূরা বাকারা-১৮৪)

কদরের রাত ভাগ্য ও মর্যাদার রাত। তাই সকল মুসলমানের কাছে এর গুরুত্ব সর্বাধিক।

কদর রাতের ফযীলত

আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

من قام ليلة القدر ایمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه.

অর্থঃ যে কদরের রাত্রে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে নামায পড়ে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।' (বােখারী,মুসলিম)

অন্য বর্ণনায় আছে, ভবিষ্যতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।ওবাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

من قامها ابتغاءها ثم وقعت له غفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر 

অর্থঃ “যে কদরের রাত্রের অন্বেষণে সেই রাতে নামায পড়ে এবং তা পেয়ে যায়,তার অতীতের ও ভবিষ্যতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।' (নাসাঈ)

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : 'রমযানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কদরের রাত লাভের উদ্দেশ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন এবং নিজ পরিবারকে জাগাতেন।' (বােখারী ও মুসলিম)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন।আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) রমযানের শেষ দশকে এত বেশী পরিশ্রম ও এবাদত করতেন যা অন্য সময় করতেন না। তিনি রমযানের শেষ দশককে এমন কিছু নেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট করতেন যা মাসের অবশিষ্টাংশের জন্য করতেন না। এর মধ্যে রাত্রি জাগরণ অন্যতম।' (মুসলিম)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ২০শে রমযান পর্যন্ত রাত্রে নামাজ ও ঘুমকে একত্রিত করতেন। কিন্তু রমযানের শেষ দশকে তিনি পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন এবং নিজ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন। (মােসনাদে আহমদ)

অন্যদিকে, তিনি রমযানের শেষ দশকে ঘুমাতেন না। কঠোর ও লাগাতার ইবাদতে মশগুল থাকতেন। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিছানা উঠিয়ে ফেলতেন, নিজ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন এবং ভাের রাত্রে সেহরীর সময় সন্ধ্যাবেলার খাবার খেতেন। (তাবারানী)

অর্থাৎ তিনি এক বেলা খেতেন এবং ভাের রাত্রে ইফতার ও সেহরী এক সাথে করতেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের এক প্রশ্নের জওয়াবে বলেন, অব্যাহত রােযা রাখার ব্যাপারে তােমরা কেউ আমার সমকক্ষ হতে পার না। আমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে খাদ্য ও পানীয় দেয়া হয়। তবে তিনি উম্মতের জন্য অব্যাহত রােযা নিষিদ্ধ করেছেন। তাই তিনি সূর্যাস্তের পর ইফতার করা ও ভােররাত্রে সােবহে সাদেকের আগে সেহরী খাওয়ার সুন্নত চালু করে গেছেন।

উপরােক্ত বর্ণনাগুলাে দ্বারা যে জিনিষটি প্রমাণিত হয় সেটা হচ্ছে, কদরের রাত

লাভ করার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং এক মিনিট সময়ও যেন নষ্ট

হয় সে ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন।

কদরের রাতে করণীয়  

রাত হবে এবং অন্যান্য সুন্নত, নফল ও মােস্তাহাব কাজগুলাে আদায় করতে হবে। এর মধ্যে মাগরিব ও এশার নামায জামাআতে আদায় করতে হবে এবং তারাবী, তাহাজ্জুদ, বিতর, কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, তাওবা এস্তেগফার ও দোয়া করতে হবে। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে হবে এবং পূর্ণ এখলাস ও আন্তরিকতার সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুৱাহ (সাঃ) বলেছেন :

من صلى العشاء الأخرة في جماعة في رمضان فقد أدرك ليلة القدر -

অর্থ : “যে রমযানে এশার নামায জামাআত সহকারে আদায় করে সে কদরের রাতের ফযীলত লাভ করে।' (আবুশ শেখ ইসপাহানী)

আমাদের পরিবার-পরিজনকেও রাত্রে জাগাতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযানের শেষ দশকে নিজ পরিবারকে জাগাতেন। তিনি নামায পড়ার জন্য হযরত আলী (রাঃ) এবং ফাতেমা (রাঃ)-কে জাগাতেন যেন তারাও ইবাদত করে। তিনি তাহাজ্জুদ শেষে বিতর পড়ার আগে আয়েশা (রাঃ)-কেও জাগাতেন।

আরেক মােরসাল হাদীসে এসেছে, আবু জাফর মােহাম্মদ বিন আলী বলেন,  রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ কোন সুস্থ্য মুসলমানের কাছে রমযান উপস্থিত হলে সে যদি রােযা রাখে, রাত্রের এক অংশে নামাজ পড়ে, নিজ চোখ অবনত রাখে,হাত পা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, জামাআত সহকারে নামায পড়ে এবং জুম'আর নামাযে তাড়াতাড়ি হাজির হয়, তাহলে সে রমযানের রােযা রেখেছে, পূর্ণ পারিশ্রমিক পেয়েছে, কদরের রাত পেয়েছে এবং আল্লাহর পুরস্কার লাভ করে ধন্য হয়েছে। অবশ্য হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ কদরের রাত্রে উম্মতে মােহাম্মদীর দিকে তাকান এবং তাদেরকে ক্ষমা ও দয়া করেন। তবে চার ব্যক্তি এ দয়ার আওতায় পড়ে না ।।

১. মদ পানকারী, ২. মাতা-পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী, ৩. হিংসুক-নিন্দুক, এবং ৪, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।

শরীয়তসম্মত ওজর আপত্তির কারণে যারা কদরের রাতে এবাদত করতে পারেনি তারাও সওয়াব পাবে বলে আল্লামা দাহ্হাক মন্তব্য করেছেন। তিনি যে সকল মহিলার হায়েজ নেফাস হয়েছে কিংবা মুসাফির অথবা যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগতে পারেনি তাদের সওয়াবের ব্যাপারে বলেন, আল্লাহ যাদের আমল কবুল করেন, তাদেরকে কদর রাত থেকে তাদের অংশ দান করবেন।

আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ রমযানে এমন এক রাত আছে যার এবাদত হাজার মাসের এবাদত অপেক্ষা উত্তম। যে এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে সে অবশ্য বঞ্চিতের কাতারে আছে।' (নাসাঈ ও মুসনাদ)

সহীহ হাদীসে বর্ণিত, কদরের রাত্রে কি দোয়া পড়া উচিত এ মর্মে আয়েশা (রাঃ)-এর এক প্রশ্নের জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, এই দোয়া পড় ঃ

اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني.

অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে পছন্দ কর। সুতরাং আমাকে ক্ষমা ও মাফ করে দাও।

সময় ও দেশ ভেদে কদরের রাত্রি 

উধ্ব জগতে সময় এক ও অভিন্ন। সেখানে সবই বর্তমান কাল। আল্লাহর কাছে অতীত ও ভবিষ্যত কাল বলতে কিছু নেই, সবই বর্তমান। পক্ষান্তরে পৃথিবীর মানুষের কাছে কাল তিন প্রকার। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত। তাই কালের ও ভৌগােলিক পার্থক্য কদরের রাত্রের মূল সময়ের বিরুদ্ধে কোন বাধা নয়। কদরের রাত মূল সময়ের সূতার সাথে গাঁথা। তাই যে ভূখণ্ডে যখন কদরের রাত উপনীত হয়, সে ভূখণ্ডে আল্লাহ কদরের মর্যাদা বিতরণ করেন। এতে ভৌগােলিক পার্থক্য সূচিত হলেও মূল সময়ের কোন পার্থক্য হয় না। কেননা সময় এক ও অবিভাজ্য।এই কারণে বিভিন্ন দেশে ভৌগােলিক পার্থক্যের দরুন লাইলাতুল কদর বিভিন্ন সময়ে উপনীত হতে পারে এবং মুসলমানরা নির্দ্বিধায় এর ফজীলত ও মর্যাদা লাভ করতে পারেন। এমনকি গােটা দুনিয়ার মুসলমানরা যদি একই দিন ধর্মীয় দিবসগুলাে পালন করে এবং মক্কা শরীফের চাঁদের তারিখ অনুসরণ করে তাহলেও কদরের রাত্রের মর্যাদা লাভের পথে কোন বাধা নেই। কেননা, আল্লাহ মূল সময়ের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে সেই মর্যাদা দান করবেন। উল্লেখ্য যে, জেদ্দা ভিত্তিক' ইসলামী ফেকাহ একাডেমী' এই মর্মে একটি ফতােয়া জারি করে বলেছেন :

দুনিয়ার সকল দেশে একই দিনে মুসলমানরা ধর্মীয় দিবসগুলাে পালন করতে পারে। যেমন, আশুরা, রমযান, লাইলাতুল কদর এবং দুই ঈদ।

কদরের রাত নির্ধারণ

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযানের মাঝের দশকে এতেকাফ করেছেন। একবার ২১শে রমযানের সকালে তার এতেকাফ থেকে বের হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি বের হয়ে বললেন, যারা আমার সাথে রমযানের শেষ দশকে এতেকাফ করতে চায় তারা যেন তা করে। আমি স্বপ্নে কদরের সুনির্দিষ্ট রাত দেখেছি এবং পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি স্বপ্নে দেখেছি,কদরের রাত্রের পরবর্তী ভােরে আমি পানি ও কাদার মধ্যে সেজদা করছি, তােমরা রমযানের শেষ দশকে কদরের রাত তালাশ করাে এবং প্রত্যেক বেজোড় রাত্রে তা।অন্বেষণ করাে। সেই (একুশে রমযানের) রাত্রেই বৃষ্টি হয়। মসজিদের চাল ছিল খেজুর পাতা ও শাখা দ্বারা তৈরি। চাল থেকে পানি পড়ে মসজিদ কর্দমাক্ত হয়ে যায়। আমি স্বচক্ষে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কপালে ২১শে রমযানের সকালে পানি ও কাদার চিহ্ন দেখতে পেয়েছি।' (বােখারী ও মুসলিম)

নবীর স্বপ্ন অহী এবং তা অবশ্যই সত্য। তাই স্বপ্নের লক্ষণ মােতাবেক ২১শে রমযানেই কদরের রাত সংঘটিত হয়েছিল। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তােমরা ১৭ই রমযান, ২১শে রমযান এবং ২৩শে রমযানে কদরের রাত তালাশ কর। এরপর তিনি চুপ রইলেন।' (আবু দাউদ)

আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তােমরা ১৭, ১৯,২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯শে রমযানে কদরের রাত তালাশ করাে।' (তাবারানী)

আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত : ‘কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম রমযানের শেষ ৭ দিনে কদরের রাতকে স্বপ্নে দেখেন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমিও তােমাদের মতাে রমযানের শেষ ৭ দিনের মধ্যে কদরের রাতকে স্বপ্নে দেখেছি। কেউ কদরের রাত তালাশ করতে চাইলে সে যেন শেষ ৭ দিনের মধ্যে তা করে।' (বােখারী ও মুসলিম)

আবদুল্লাহ বিন ওমার থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ তােমরা রমযানের শেষ দশকে কদরের রাত তালাশ করাে। তােমাদের কেউ যদি দুর্বল ও অক্ষম হয় তা যেন শেষ ৭ দিনের উপর প্রভাব বিস্তার না করে।' (মুসিলম)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘তােমরা রমযানের শেষ দশকে কদরের রাত তালাশ করাে।' (বােখারী ও মুসলিম) 

বােখারী শরীফের এক বর্ণনায় এসেছেঃ শেষ দশকের বেজোড় রাত্রে কদরের রাত অন্বেষণ করাে।'

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেছেনঃ তােমরা রমযানের শেষ দশকের ২৯, ২৭ ও ২৫ তারিখে কদরের রাত তালাশ করাে।' (বােখারী)

আবুজার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ? আমি কি তােমাকে কদরের রাত সম্পর্কে (অতিরিক্ত কিছু) জিজ্ঞেস করতে নিষেধ করিনি? আল্লাহ যদি এ ব্যাপারে তােমাদেরকে জানানাের জন্য আমাকে অনুমতি দেন, আমি অবশ্যই তা জানাবাে। আমার বিশ্বাস যে তা রমযানের শেষ ৭ দিনের মধ্যে নিহিত আছে। (ইবনে হিব্বান ও হাকেম)

আবু হােরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি,আমি কদরের রাত্রের ভােরে পানি ও কাদার মধ্যে সেজদা করছি। তিনি ২৩শে রমযানের ভােরে নামায শেষে প্রত্যাবর্তন করলে তার কপালে পানি ও কাদার চিহ্ন দেখা যায়। (মুসলিম)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত ও ‘এক ব্যক্তি বললাে, ইয়া রাসূলুল্লাহ(সঃ)! আমি একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি। আমার জন্য রাত্রের নামাজ খুব কষ্টকর। আমাকে এমন এক রাতের আদেশ দিন যে রাত হবে কদরের রাত তিনি বলেন, তুমি ২৭শে রমযানের রাতকে আঁকড়ে ধরাে।' (মুসনাদে আহমদ) 

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ তােমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কদরের রাত তালাশ করে সে যেন ২৭শে রমযানে তা তালাশ করে। (আহমদ)

কেউ কেউ বলেছেনঃ সূরা কদরে মােট ৩০টি শব্দ আছে।

هي حتى مطلع الفجر -

এ -এর মধ্যে ২৭তম শব্দ। অর্থঃ সেটি কদরের রাত। আবার কেউ কেউ বলেছেন - 

انا انزلناه في ليلة القدر

 - এই আয়াতটি সূরা কদরে ৩ বার এসেছে। প্রতি আয়াতে ৯টা করে অক্ষর আছে। ফলে ৩x৯=২৭ হচ্ছে কদরের রাত। এটা হচ্ছে, প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।

উপরােক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে, কদরের রাতটি রহস্যময়। আল্লাহ প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তা জানিয়ে দেন এবং পরে আবার তাকে ভুলিয়ে দেন। এটি গােপন রাখার উদ্দেশ্য হলাে, মুসলমানগণ যেন তা লাভ করার জন্য যারপর নাই।চেষ্টা সাধনা করেন।

ওবাদা বিন সামেত থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একদিন কদরের রাত সম্পর্কে বলতে বের হন। তখন মসজিদে দুইজন লােক ঝগড়া করছিল। এর ফলে আল্লাহ তাঁর অন্তর থেকে কদরের সুনির্দিষ্ট তারিখটি মুছে দেন। ফলে তিনি তারিখটি ভুলে যান। (বােখারী) 

ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কদরের রাত্রের বিষয়ে বিরাট মতভেদ আছে। এ ব্যাপারে আল্লামা শাওকানী আল ফাতাহ কিতাবের বহু বক্তব্য থেকে ৪৫টি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।

এক মত অনুযায়ী প্রতি বছর রমযানে ভিন্ন ভিন্ন রাতে কদর আসে। অর্থাৎ প্রতি বছর একই রাত বা নির্দিষ্ট তারিখে আসে না। এটি ইমাম মালেক, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরী ও ইসহাক বিন রাহওয়াইর মত। 

ইমাম শাফেয়ীর মতে ২১শে রমযান হচ্ছে অগ্রাধিকারযােগ্য।

ইবনে মাসউদের বর্ণনা অনুযায়ী ২য় মত হচ্ছে এটি রমযান কিংবা বছরের যে কোন রাত হতে পারে। হাদীসে এর কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই। এটি ইমাম হানিফার মত। আল্লামা সাবকী এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

৩য় মত হচ্ছে, এটি রমযানের দ্বিতীয়ার্ধে। এটি ইমাম মােহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফের মত। ৪র্থ মত হচ্ছে বদরের রাতেই কদরের রাত হয়। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বলেছেন, তা ১৭ই রমযান। আবার অন্য কেউ বলেছেন ১৯শে রমযান।

তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, লাইলাতুল কদর হচ্ছে রমযানের শেষ দশকে। হাসান বসরী ও ইমাম মালেক বলেছেন, শেষ দশকের প্রতি রাত্রেই লাইলাতুল কদর তালাশ করতে হবে। জোড় বেজোড় সকল রাত্রিই সমান। মাস ৩০ দিনে হলে, বেজোড় রাত্রিতে তালাশ করতে হবে। কিন্তু মাস ২৯ দিনে হলে জোড় রাত্রিগুলাে থেকে বিশ পর্যন্ত ১০ দিন হিসেব করতে হবে। তখন জোড় রাত্রে কদর হবে। মাস ৩০ হবে না ২৯ হবে তা অগ্রিম জানার উপায় নেই। তাই সকল রাত্রেই কদর তালাশ করতে হবে।

“কিন্তু অধিকাংশ ওলামা জোড় রাত্রের চাইতে বেজোড় রাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেন, বেজোড় রাত্রেই কদর তালাশ করা দরকার। ২১ ও ২৩শে রমযানে কদরের আগমন সম্পর্কে দুটো হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এগুলােও বেজোড়। তবে ২৭শে রমযানে কদরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এছাড়াও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বেজোড় রাত্রে কদর তালাশ করার কথা বলা হয়েছে।সকল বর্ণনা ও মতভেদগুলােকে সামনে রেখে ২টা ভিত্তি গ্রহণ করলে কিছুটা সুরাহা হয়। প্রথমটা হচ্ছে, লাইলাতুল কদর রমযানের শেষ দশকে। কদরের অন্বেষণেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রথম প্রথম রমযানের ১লা দশকে ও পরে ২য় দশকে এতেকাফ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি স্থায়ীভাবে শেষ দশকে এতেকাফ করেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, কদর শেষ দশকে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, শেষ দশকে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন দিনে কদর হয়। তাহলে ভিন্ন ভিন্ন দিবসে কদর অন্বেষণের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীসগুলাের একটা সমন্বয় সাধন করা যায়। যেহেতু, হাদীসে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখে লাইলাতুল কদর তালাশ করা এবং তা সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা উল্লেখ আছে।কদর রাত্রির আলামত প্রসঙ্গে ওবাদাহ বিন সামেত (রাঃ) নবী করীম (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ঐ রাতে আকাশ থেকে কোন উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয় না। এর আরাে লক্ষণ হলাে, ঐদিন ভােরে সূর্যের আলাে প্রখর থাকে না। বরং পূর্ণিমার চাদের মতাে স্নিগ্ধ আলাে থাকে। ঐদিন শয়তানের বের হওয়ার অনুমতি নেই।(মুসনাদে আহমদ)

তাবারানী ওয়াসেলা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং সুয়ূতি এটাকে উত্তম হাদীস বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ কদরের রাত আলােকোজ্জ্বল থাকে এবং না ঠাণ্ডা না গরম। ঐ রাতে আকাশে কোন মেঘ থাকে না এবং ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয় না। আকাশ থেকে কোন উল্কাপিণ্ড পড়ে না এবং সকাল বেলায় সূর্যের আলোর তেজ থাকে না।

শাফেঈ মাযহাবের মতে, কদরের রাতে গরম ও ঠাণ্ডা কোনটাই থাকবে না। সকাল বেলায় সাদা সূর্য উদিত হবে এবং তার আলাে বেশী থাকবে না। সূর্য এক বল্লম পরিমাণ উপরে উঠা পর্যন্ত ঐ অবস্থা বিদ্যমান থাকবে। এর রহস্য হলাে, অধিক পরিমাণ ফেরেশতার উঠা-নামার কারণে সূর্যের আলােক রশ্মির উপর তাদের সূক্ষ্ম দেহ ও পাখার ছায়া পড়ে। রাত শেষে কদরের ঐ লক্ষণ জানার ফায়দা হচ্ছে,দিনেও বেশী বেশী এবাদত করা এবং তা সুন্নাহ। আগামী বছরও কদরকে এই রাত অপরিবর্তনীয় মনে করে এবাদত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

যাহরাহ বিন মা'বাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি শত্রুর ভূখণ্ডে ছিলাম। তখন আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমি ২৩শে রমযানে সাগরে অবস্থান করছিলাম। আমি গােসল করতে গিয়ে সাগরে পড়ে যাই। তখন দেখি পানি মিষ্টি। আমি আমার সাথীদেরকে জানাই যে, আমি মিষ্টি পানির মধ্যে আছি।'

সাগরের পানি সর্বদা লবণাক্ত থাকে। কিন্তু কদরের উসিলায় আল্লাহ সেদিন তা মিষ্টি পানিতে রূপান্তর করে দিয়েছিলেন। ইবনে আবদুল বার বলেছেনঃ

মদীনাবাসীদের কাছে ঐ রাত ‘জোহানী রাত' নামে পরিচিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবদুল্লাহ বিন উমাইস জোহানীকে ঐ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন।প্ৰকতৃপক্ষে কদরের রাতের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষণ পূর্ব থেকে জানার উপায় নেই।তাই মুমিনকে তা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হবে ও পেরেশানীর সাথে অপেক্ষা করতে হবে।