সাগরে নিমজ্জিত ফেরাউন




 
মিশর ত্যাগের প্রাক্কালে আল্লাহ পাক হযরত মূসা ( আঃ ) কে অহীর মারফত জানিয়ে দিয়েছিলেন যে , লোহিত সাগর তীরে উপনীত হবার পর আপনার হাতের লাঠি দ্বারা পানিতে আঘাত করলে শুষ্ক রাস্তা সৃষ্টি হয়ে যাবে আর আপনি বনী ইসরাইলদের নিয়ে নিরাপদে সাগরের অপর পাড়ে দৌড়ে যাবেন । কিন্তু লোহিত সাগর তীরে পৌঁছে হযরত মূসা ( আঃ ) কথা বেমালুম ভুলে গেলেন ফলে তিনি করণীয় স্থির করতে পারছিলেন না অন্য দিকে ধরা পড়ার ভয়ে বনী ইসরাইলদের করুণ আর্তনাদ তারাতো পেছনে সাক্ষাৎ যমদূত দেখতে পাচ্ছে ফলে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে । এরূপ অবস্থায় আল্লাহ পাক মেহেরবানী করে তাকে পুনরায় ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন লাঠি দ্বারা পানিতে আঘাত করার কথা । 
 
   ᐅᐤ  কোনো কোনো বর্ণনায় এও পাওয়া যায় । যে , হযরত মুসা ( আঃ ) বনী ইসরাইলদের নিয়ে লোহিত সাগর পাড়ে উপনীত হয়ে তিন দিন তিন রাত অবস্থান করেছিলেন এ রেওয়ায়েত বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় । যাহোক অহী প্রাপ্তির পর হযরত মূসা ( আঃ ) তাঁর লাঠি দ্বারা সাগরের পানিতে আঘাত করার সাথে সাথে বনী ইসরাইলের বারটি শাখা গোত্রের জন্য বারটি রাস্তা হয়ে যায় । আর পানি রাস্তার উভয় পার্শ্বে বরফের ন্যায় কঠিন পদার্থের আকার ধারণ করে পর্বত , সদৃশ দাঁড়িয়ে থাকে দেখলে মনে হয় যেন দু'দিকেপাহাড় আর তার মাঝখানে রাস্তা আল্লাহ পাকের অপার কুদরতে লোহিত সাগরের মাঝ দিয়ে সৃষ্ট পথে হযরত মূসা আঃ ) এর নির্দেশে বারটি গোত্র এক এক রাস্তা ধরে নেমে পড়ে । রাস্তাগুলোর মাঝখানের শক্ত বরফ সদৃশ পানিকে আল্লাহ এমন করে দিয়েছিলেন যে , যাতে রাস্তা অতিক্রমকারীরা পরস্পরকে দেখতে পায় এবং পরস্পরের সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে পথ অতিক্রম করতে পারে এবং অতিদ্রুত তারা নিরাপদে লোহিত সাগরের অপর পাড়ে গিয়ে উঠতে সক্ষম হয় । ওদিকে পিছন দিক থেকে ফেরাউন লোক লস্করসহ লোহিত সাগর পাড়ে পৌঁছে যায়।
 
 পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ ইরশাদ     করেছেন। 
  
   ᐅᐤ   অতঃপর মসার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম , এই মর্মে যে , আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রীযোগে বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে এক শুষ্ক পথ নির্মাণ কর । পশ্চাৎপথ হতে এসে তোমাদের ধরে ফেলা হবে এ আশংকা করো না এবং ভয়ও করো না । অতঃপর ফেরাউন তার সৈন্য বাহিনী সহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল । তারপর সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করল । ফেরাউন সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্ট করেছিল এবং সৎপথ দেখায়নি।( সূরা ত্বোয়া - হা - ৭৭-৭৯ ) 
    
  ᐅᐤ  কোন এক বর্ণনায় দেখা যায় , ফেরাউন তার লোকলস্করসহ বনী ইসরাইলদের   এতই নিকটে পৌঁছে যায় যে , ফেরাউন  বাহিনী প্রথম ব্যক্তি যখন সাগর পাড়ে পৌঁছে তখন বনী ইসরাইলদের সর্বশেষ ব্যক্তি পাড় থেকে সাগর পথে অবতরণ করছিল । অবশ্য তাকে ধরতে পারেনি । 
    দেখতে ইত্যবসরে দেখতে ফেরাউনের ষোল লক্ষ লোক সাগর পাড়ে পৌঁছে যায় । সাগর পাড়ে পৌঁছে তারা একজন লোকও তীরে দেখতে পায়নি বরং তারা সাগরে সৃষ্ট পথের দৃশ্য অবলোকন করে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে । কারণ এমন পথ মানব কল্পনার অতীত । যা কেউ কোন দিন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি , তাই আজ বাস্তবে দেখতে পাচ্ছে । অন্তহীন বিস্ময় তারা কারো মুখ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে থেকে কোন কথাও বেরুচ্ছে না । যখন সকল সৈন্য রাস্তায় নামল , কেহই আর তীরে থাকলনা । ওদিকে তখন পর্যন্ত তীরেও কোন লোক রাস্তা পার হয়ে উঠলনা । 
    
   ᐅᐤ   ঠিক এই মুহূর্তে রাস্তার উভয় দিক হতে পাহাড় সমান উঁচু আটকানো পানি সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মত হৃদয় কাঁপানো গর্জনে ভেঙ্গে পড়ে রাস্তাগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিল । দিশেহারা ফেরাউন ও তার সৈন্য - সামন্তসহ ষোল লক্ষ লোক ( কিতী সম্প্রদায় ) কে সমুদ্রে গ্রাস করে ফেলল । জালোচ্ছ্বাসের প্রবল দাপটে সব লোকই ডুবে মরল । একটি লোকও প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হলনা । 
    
   ᐅᐤ  বনী ইসরাইলগণ সাগরের অপর পাড় হতে ফেরাউন ও তার সৈন্য সামন্তদের এপাড়ের দিকে আসতে দেখে ভয়ে থর থর করে কাঁপতে ছিল । পরক্ষণে তাদের অভাবনীয় দৃশ্য অবলোকনে তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে । তারা ভাবছে তারা কি স্বপ্ন দেখছে ? ফেরাউন এসে সৈন্য সামন্তদেরকে লক্ষ্য করে বলল , “ দাঁড়িয়ে কি ভাবছ ? যা কিছু দেখতে পাচ্ছ তা সবই আমার সৃষ্ট । আমার ভয়ে ভীত হয়ে সাগর স্বীয় ৰক্ষ বিদীর্ণ করে পথ করে দিয়েছে । সুতরাং সবাই সামনে অগ্রসর হওঁ । এই বলে অভিশপ্ত ফেরাউন সাগর পথে নিজের ঘোড়া চালিয়ে দেয় । সৈন্য সামন্ত ও লোকজনও তাকে অনুসরণ করে । বনী ইসরাইলগণ এ দৃশ্য দেখে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে । কেননা সাগর বক্ষে বারটি শুকনো রাস্তা তখনও অক্ষুণ্ণ ছিল ল । তদুপরি ফেরাউনের সৈন্যগণ ছিল অশ্বারোহী । এ করুণ দৃশ্য দেখে আনন্দের সাথে দিতে লাগল । আল্লাহ উল্লাসধ্বনি আকবর ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মাতোয়ারা করে তুলল । তারা যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে এই বোধ শক্তি তাদেরকে আল্লাহ শোকর গোজারী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে ।
     
   ᐅᐤ  অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় , ফেরাউন সাগর পাড়ে এসে সাগর বক্ষে রাস্তার দৃশ্য দেখে ভাবনায় পড়ে যে , ইহা কি মূসা ( আঃ ) -এর যাদু ! মোজেজার সৃষ্ট কল্যাণে ? ইহা তাঁর মোজেজার সৃষ্ট মনে করলে লোকলস্কর তো তাঁর প্রতি ঈমান এনে বসবে । তাহলে তো আমার এতদিনকার অসার খোদায়ী দাবীর প্রতারণার প্রাসাদ নিরস্ত্র । সুতরাং ফেরাউনের সেনা দলের মুহূর্তেই ধূলিস্যাত হয়ে যাবে। হাতে ধরা পড়ে তারা নিঃশেষ হয়ে যাবে জনগণের কাছে ভীষণ ভাবে লজ্জিত হতে  হবে । 
    
   ᐅᐤ   এ ক্ষেত্রেও এক মাকড়সার জালের মত দুর্বল কৌশল অবলম্বনের দুরাকাঙ্ক্ষা আগ করতে পারেনি । সে সৈন্য - সামন্ত , লোকজনের উদ্দেশ্যে বলল , “ সাগরে রাস্তা সৃষ্টিতে আজ আমার দৃঢ় প্রতিতী জন্মেছে যে , মূসা আসলেই এক মহাদক্ষ যাদুকর ।
    
   ᐅᐤ  স্বীয় যাদু বলে সাগরের মধ্য দিয়ে রাস্তা সৃষ্টি করে দিয়েছে । যাতে করে মানুষজন এ দৃশ্য অবলোকন করে তাঁর কথিত আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং তাঁর রেসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁকে রাসূল বলে স্বীকৃতি দেয় পাপিষ্ঠ অভিশপ্ত ফেরাউন মুখে এসব কথা বললেও তার মনে এ ভয় ছিল যে , যদি হযরত মূসা ( আ . ) - এর সৃষ্ট পথ ধরে সৈন্য - সামন্ত নিয়ে সাগরে নেমে পড়ি আর বারটি রাস্তার উভয় পার্শ্বের পাহাড় সদৃশ স্থিত পানি রাশি আবার পূর্ববৎ মিলিত হয়ে যায় তবেতো সৈন্য - সামন্ত , লোকজন সহ আমাকেও সলিল সামাধি হতে হবে । এ ভয়ে সে মুখে যাই বলুক সাগরে নামতে ভয় পাচ্ছিল । সাগরে না নামলে তো আল্লাহর ইচ্ছা অপূরণ থেকে যায় আর ফেরাউন বেঁচে যায় । তাই আদেশে হযরত আল্লাহ পাকের জিবরাইল ( আঃ ) মানুষ বেশে এক ঘোটকীর উপর সওয়ার হয়ে ফেরাউনের ঘোটকের সামনে উপস্থিত হন ।
     
   ᐅᐤ  ফেরাউনের ঘোটক ঘোটকী দেখে তার কাছে অগ্রসর হতে উৎসুক হয়ে পড়ে । জিবরাইল ( আঃ ) তার ঘোটকীকে সাগরে করেন অমনি সৃষ্ট পথে চালিত ফেরাউনের ঘোটকও তাকে অনুসরণ করে । ফেরাউন লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় । ফলে তার ঘোটকও তাকে নিয়ে সাগর বক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েঅশ্বারোহী সৈন্যের অন্যান্য অশ্বগুলোকেও ফেরেশতারা চাবুক মেরে তার পশ্চাৎগামী হতে বাধ্য করে । এদের দেখাদেখি তার ষোললক্ষ লোকজন সবাই সাগরে সৃষ্ট বারটি রাস্তা ধরে এগুতে থাকে । পাপিষ্ঠরা যখন সাগরের মাঝখানে পৌঁছে অমনি পর্বত সদৃশ স্থির পানি রাশি পূর্ববৎ মিলিত হয়ে তাদেরকে সাগর বক্ষে নিমজ্জিত করে । 
      
   ᐅᐤ  এভাবেই ফেরাউন তার দলবলসহ ধরা পৃষ্ট থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় । ফেরাউন যখন সাগর সলিলে নিমজ্জিত হচ্ছিল তখন আযাবের ফেরেশতাদের সামনে দেখতে পাচ্ছিল তখন সে আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপন করে । তখন বলতে লাগল , “ আমি ঈমান আনছি । তার উপর যার উপর বনী ইসরাইলীরা ঈমান এনেছে । ” কিন্তু আল্লাহ বলেন , এখন ঈমান আনছ কিন্তু এর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি নাফরমানী করছিলে । তুমিত ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ।
       " উপরে বর্ণিত ঘটনা প্রবাহের ব্যাপারে আল - কোরআনের ভাষ্য দেখুন “ অতঃপর আমি মূসার প্রতি অহী নাজিল করলাম , তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর । ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতসদৃশ্য হয়ে গেল । আমি সেথায় অপর দলটিকে উপনীত করলাম এবং আমি উদ্ধার করলাম মুসা ও তার সঙ্গীদেরকে । তৎপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে । নিশ্চয় এতে একটি নিদর্শন রয়েছে । কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিলনা । আর নিশ্চয়ই প্রতিপালক পরাক্রমশালী , পরম দয়ালু । ” আপনার ( সূরা শুয়ারা - ৬৩-৬৮ )
       
    ᐅᐤ  অন্যত্র আল্লাহ পাক এরশাদ করেনসুতরাং আমি তাদের উপর দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছি এবং তাদেরকে অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছি । কারণ তারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যখ্যান করত এবং এ সম্বন্ধে তারা অনীহা প্রদর্শন করেছিল যে সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হতো তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি এবং বনী ইসরাইল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভবাণী সত্যে পরিণত হলো । যেহেতু তারা ধৈর্যধারণ করেছিল । আর ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যে সব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করেছি । ” ( সূরা আরাফ - ১৩৬-১৩৭ )
        
    ᐅᐤ  ফেরাউনের ঈমান গ্রহণ কবুল না হলেও আল্লাহ পাক পরবর্তী লোকদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ তার দেহ রক্ষা করার ওয়াদা করেছিলেন । মিশরের যাদুঘরে আজও ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষিত আছে । আশ্চর্যের ব্যাপার ! মমী করা নয় কোন রাসায়নিক পদার্থের প্রলেপ দেয়া নয় অথচ হাজার হাজার বছর ধরে একটি মৃতদেহ পচনশীলতার হাত থেকে রেহাই পেয়ে আজও অবিকল আছে । আল্লাহ পাকের ওয়াদা রক্ষার এক জাজ্বল্যকর প্রমাণ ইহা । ফেরাউন ও তার দলবল লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হওয়া এবং তার দেহ রক্ষা করার ব্যাপারে আল কোরআন সাক্ষ্য দেয় আর আমি বনী ইসরাইলকে সমুদ্র পার করালাম । 

    ᐅᐤ  ফেরাউন সৈন্যবাহিনী বিদ্বেষ পরবশ হয়েও ন্যায়ের সীমালঙ্ঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল । পরিশেষে যখন সে নিমজ্জিত হতে লাগল , তখন সে বলল , আমি বিশ্বাস করলাম যা বনী ইসরাইল বিশ্বাস করে । তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত । এখন একথা বলছ ইতিপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছ এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে । আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক । অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকেই আমার নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল । " ( সূরা ইউনুস - ৯০-৯২ )