হজের গুরুত্ব ও উপকারিতা

 ( السلام  عليکم  ورحمة الله وبركاته )       

          হজের পরিচয় :☪    

(হজ্জ)   শব্দটি আরবি । এর আভিধানিক অর্থ- ইচ্ছা করা , সংকল্প করা ইত্যাদি । আর ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় হজ হচ্ছে- আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট কার্যাবলির মাধ্যমে বায়তুল্লাহ জিয়ারত করা ।


        হজ তিন প্রকার :☪         

♻️   হজে ইফরাদ : -     ইফরাদ অর্থ- একাকী , একক । পরিভাষায় হজের মাসে মিকাত থেকে শুধু হজের ইহরাম বেঁধে হজ সম্পাদন করাকে ইফরাদ বলা হয় ।

♻️  হজে তামাত্তু : -     তামাত্তু অর্থ- উপভোগ করা , ফায়দা লাভ করা ইত্যাদি । পরিভাষায় হজের মাসে মিকাত থেকে প্রথমে ওমরা পালনের জন্য ইহরাম বেঁধে ওমরার কাজ সমাপ্ত করে হালাল হওয়া । এরপর জিলহজের ৮ তারিখে হজের ইহরাম বেঁধে হজ সম্পন্ন করাকে তামাত্তু বলা হয় । 

♻️  হজে কিরান : -   কিরান অর্থ সংযুক্ত করা , সম্পৃক্ত করা , একত্র করা ইত্যাদি । পরিভাষায়- হজের মাসে মিকাত থেকে ওমরাহ ও হজের নিয়তে একসাথে ইহরাম বাঁধাকে কিরান বলা হয় ।

     হজের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য : ☪

  হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম । আর্থিক ও শারীরিক ইবাদতের মধ্যে মনের হজের স্থান শীর্ষে । মুসলিম জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ মহাসম্মেলন হলো হজ । পুণ্যময় হজ মুসলিম জাতির সামাজিক , রাজনৈতিক , আধ্যাত্মিক ঐক্য এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ সৃষ্টির প্রকৃষ্ট নিদর্শন । 

 হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত

  قال رسول  الله صلى الله عليه وسلم* بنى الاسلام على خمس * شهادة ان لا اله الا الله وان محمد ار سول الله * واقام الصلوة * وايتاءالزکوة  *والحج *وصوم رمضان🔸

 অর্থ : মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

       ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি :☪

♻️   আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল- এ কথার সাক্ষ্য দেয়া ।

♻️  সালাত কায়েম করা ।

♻️  জাকাত আদায় করা ।

♻️  হজ পালন করা ।

♻️  রমজান মাসে রোজা রাখা । ( বুখারি শরিফ , হাদিস নং ০৮ ) 

সামর্থ্যবানদের হজ করার নির্দেশ প্রদান করে মহান আল্লাহ বলেন -

 والله على الناس حج البيت من استطاع اليه سبيلا ومن کفر فان الله غنى عن العلمين

অর্থ : আর প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ । আর যে কুফরি করবে , তবে তার জেনে রাখা উচিত যে , আল্লাহ নিশ্চয়ই সৃষ্টিকুলের প্রতি মুখাপেক্ষী নয় ।

 ( সুরা আলে ইমরান , আয়াত নং ৯৭ ) 

 মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন -

 ان الله قد فرض اليوم الحج فيجا

 অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন । সুতরাং তোমরা হজ পালন করো ।

  ( সহিহ মুসলিম , ১/৪৩২ ) 

  

  - হজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে । লোক দেখানো বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হজ করলে হজ আদায় হবে না । আর হজ ফরজ হলে বিনা কারণে বিলম্ব করা উচিত নয় । বিলম্ব করলে কতিপয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে । যেমন যেকোনো সময় সে অসুস্থ হতে পারে কিংবা তার মৃত্যু হতে পারে । অথবা যেকোনো সময় তার সম্পদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিংবা সে বাধার সম্মুখীন হতে পারে । শুধু তাই নয় , বায়তুল্লাহ ওঠিয়ে নেয়া হলে মানুষ চাইলেও হজ করতে পারবে না । এ আশঙ্কার কারণেও মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম তাড়াতাড়ি হজ করার নির্দেশ দিয়েছেন । হযরত ইবনে ওমর রাযি . থেকে বর্ণিত , রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম ইরশাদ করেছেন- তোমরা হজ ও ওমরার মাধ্যমে এই ( বায়তুল্লাহ ) গৃহের উপকার গ্রহণ করো । কেননা তা ইতোপূর্বে দু’বার ধ্বংস হয়েছে । তৃতীয়বারের পর ওঠিয়ে নেয়া হবে ।

    ( সহিহ ইবনে খুযাইমা , হাদিস নং ২৫০৬ # সহিহ ইবনে হিব্বান , হাদিস নং ৬৭১৮ # মুসতাদরাকে হাকিম , হাদিস নং ১৬৫২ )    

   - আমাদের দেশে একটা প্রথা হয়ে গেছে যে , এক শ্রেণির মানুষ বুড়ো হওয়ার আগে হজে যাওয়ার খেয়াল করে না । চাকরিজীবীরা অপেক্ষায় থাকে কবে অবসরে যাবে , তখন পেনশনের টাকা দিয়ে হজ করবে । ব্যবসায়ীরা চিন্তা করে , এখন হজে গেলে সব ভেজাল কারবার ছেড়ে দিতে হবে । একটু ব্যবসা - বাণিজ্য করে নিই , পরে হজ করে এসে ভালো হয়ে যাবো । যুবকরা ভাবে , এখন আনন্দ ফুর্তি করার বয়স । বৃদ্ধ বয়সে হজ করে এসে তাসবিহ নিয়ে মসজিদে বসে পড়বো । এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে হজ করতে বিলম্ব করে । অথচ যৌবনে হজ করা সৌভাগ্যের বিষয় এবং আল্লাহর দরবারে অধিক গ্রহণযোগ্য । কেননা হজ এমন একটি ইবাদত , যা আঞ্জাম দিতে যথেষ্ট শারীরিক শক্তির প্রয়োজন রয়েছে । যা শুধুমাত্র একজন সুস্থ - সবল লোকের দ্বারাই পরিপূর্ণভাবে সম্ভব ।  

  - হজ করার শক্তি - সামর্থ্য ও অর্থ - বিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ করে না , তার সম্পর্কে হাদিসে কঠোর হুমকি দেয়া হয়েছে । হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি . বলেন- যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে , তবুও হজ করে না , সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করলো নাকি খ্রিস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করলো , তাতে আল্লাহর কোনো পরোয়া নেই ।

  ( তাফসিনে ইবনে কাসির , ১/৫৭৮ )

           হজের ফজিলত:☪

 ☑️   Hazz is an important way to be intimate with Allah .

    অর্থাৎ , আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রিয়বান্দা হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো হজ । যারা হজের সফরের সৌভাগ্য লাভ করেন তারা যেন আল্লাহর মেহমান । তাই প্রত্যেকের উচিত সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর ইশক - মুহাব্বাতের অনুভূতি নিয়ে সেখানে অবস্থান করা । বায়তুল্লাহ ও আল্লাহর অন্যান্য নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা । যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা । দ্বন্দ - কলহ , ঝগড়া বিবাদ এবং অন্যায় - অশ্লীলতা থেকে সর্বাত্মকভাবে দূরে থাকা ।   

 এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন -

 الحج اشهر معلومات فمن فرض فيهن الحج فلا رفض ولا فسوق ولا جدال فى الحج وما تفعلوا من خير يعلمه الله.

 -  অর্থ : হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে । যে ব্যক্তি সেসব মাসে ( ইহরাম বেঁধে ) নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয় ; সে হজের সময় কোনো অশ্লীল কথা বলবে না , কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না । তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করবে , আল্লাহ তা জানেন ।

    ( সুরা বাকারা , সুরা নং ২ , আয়াত নং ১৯৭ )  

   -  হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত , মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি হজ করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না , তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয় ।

      ( সুনানে তিরমিজি , হাদিস নং ৮১১ )    

 -  অন্য বর্ণনায় আছে , হযরত আবু হুরায়রা রাযি . বলেন , আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামকে বলতে শুনেছি- যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি । অর্জনের জন্য হজ করলো এবং অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকলো , সে ওইদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ থেকে ফিরে আসবে , যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ।

    ( সহিহুল বুখারি , হাদিস নং ১৫২১ )  

   -  হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত , মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- এক ওমরাহ আরেক উমরাহ পর্যন্ত  মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায় । আর হজে মাবরুরের ( কবুল হয় ) প্রতিদান হলো জান্নাত। 

      ( সহিহুল বুখারি , হাদিস নং ১৭৭৩ )    

   - উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রাযি . থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , ইয়া রাসুলাল্লাহ , আমরা তো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি , আমরা কি জিহাদ করবো না ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- না , বরং নারীদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো হজে মাবরুর ।

     ( সহিহুল বুখারি , হাদিস নং ১৫২০ # মুসনাদে আহমদ , হাদিস নং ২৪৪২২ )

  - হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত , মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- বৃদ্ধ , দুর্বল ও নারীর জিহাদ হলো হজ ও ওমরাহ ।

    ( মুসনাদে আহমদ , হাদিস নং ৯৪৫৯ )  

 - হযরত জাবির রাযি . বর্ণনা করেন , মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- হজ ও উমরাহকারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি দল । তারা দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদরেকে তা দেয়া হয় ।

   ( মুসনাদে বাযযার , হাদিস নং ১১৫৩ # মাজমাউয যাওয়াইদ , হাদিস নং ৫২৮৮ ) 

  -  হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত , রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আল্লাহ তাআলা হাজিদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং হাজিরা যাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন , তাদেরকেও আল্লাহ ক্ষমা করেন ।

     ( মুসনাদে বাযযার , হাদিস নং ১১৫৫ # সহিহ ইবনে খুযাইমা হাদিস নং ২৫১৬ ) 

 -  হযরত বুরাউদা রাযি . থেকে বর্ণিত , মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- হজের জন্য খরচ করা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার মতোই । যার সাওয়াব ২৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় ।

    ( মুসনাদে আহমদ , হাদিস নং ২৩০০০ # শুয়াবুল ঈমান বাইহাকি , হাদিস নং ৪১২৫ # তাবারানি আউসাত , হাদিস নং ৫২৭০ )   

  -  আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি . থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- যে ব্যক্তি যথাযথভাবে সাত বার বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে , তার একটি গোলাম আজাদ করার সমান সাওয়াব হয় । তাওয়াফের প্রতি কদমে আল্লাহ তার একটি করে গুনাহ মাফ করেন , একটি করে নেকি লিখেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন ।

    ( মুসনাদে আহমদ , হাদিস নং ৪৪৬২ )  

   -  ইবনে ওমর রাযি . থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির স্পর্শ মানুষের পাপসমূহ মুছে দেয় ।

      ( মুসনাদে আহমদ , হাদিস নং ৫৭০১ )    

    - আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি . বলেন , মহানবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- হাজরে আসওয়াদ ছিলো জান্নাতের পাথর । তা দুধের চেয়েও সাদা ছিল । কিন্তু আদম সন্তানের গুনাহ একে কালো করে দিয়েছে ।

     ( সুনানে তিরমিজি , হাদিস নং ৮৭৭ )   

  -   এভাবে অসংখ্য হাদিসে হজের ফজিলতের বর্ণনা রয়েছে । কাজেই সামর্থ্য থাকলে হজ করতে হবে । এতে একদিকে আল্লাহর নির্দেশ পালন হবে , অপরদিকে অগণিত সাওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে । এবার হজের কিছু নিয়মকানুন আলোচনা করছি ।    

          - হজের পটভূমি :☪            

    -  হজের বিধান হযরত আদম আ . থেকে চলে আসছে । যেদিন বায়তুল্লাহর ভিত্তি রাখা হয়েছে , সেদিন থেকেই এর তাওয়াফ ও জিয়ারত শুরু হয়েছে । কোনো দিন বন্ধ হয়নি , আর কখনো বন্ধ হবেও না । বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে এই ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে এবং তা পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছে । হযরত নুহ আ . - এর মহাপ্লাবনের সময় এর কোনো চিহ্ন ছিল না । আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাইল আ . - এর মাধ্যমে হযরত ইবরাহিম আ . - কে এর স্থান চিহ্নিত করে দিলে তিনি তা পুননির্মাণ করেন । এরপর মহান আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ . - কে বললেন- ‘ আর মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও । তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং দুর্বল উটে চড়ে দূর - দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে ।

       ( সুরা হজ , সুরা নং ২২ , আয়াত নং ২৭ ) 

 - হযরত ইবরাহিম আ . বললেন , হে আল্লাহ , জনমানবহীন এই শূন্য প্রান্তরে কে আমার আহ্বান শুনবে ? তারপর হযরত ইবরাহিম আ . মাকামে ইবরাহিমে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন । কোনো কোনো বর্ণনায় আছে , তিনি আবু কুবাইস পাহাড়ে আরোহণ করে দুই কানে আঙুল রেখে ডানে - বামে , পূর্ব পশ্চিমে মুখ করে বললেন- ‘ লোকসকল , তোমাদের পালনকর্তা নিজগৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন । তোমরা সকলে পালনকর্তার নির্দেশ পালন করো ।

 -  তাফসিরে ইবনে কাসিরে উল্লেখ রয়েছে যে , হযরত ইবরাহিম আ . - এর এ আহ্বান আকাশে - বাতাসে , পাহাড়ে - প্রান্তরে সর্বত্র ধ্বনিত হয় । মহান আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ . - এর এ আহ্বানের আওয়াজ বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে দেন এবং শুধু তখনকার জীবিত মানুষ পর্যন্ত নয় , বরং কিয়ামত পর্যন্ত যারা । আসবে আলমে আরওয়াহে তা তাদের কাছে পৌঁছে দেন । সেদিন সে আহ্বানে যারা ' লাব্বাইক ' বলে সাড়া দিয়েছিল , তারা একদিন না একদিন ‘ লাব্বাইক ’ বলতে বলতে আরাফার ময়দানে হাজির হবে এবং হজ করবে ইনশাআল্লাহ । যে বার লাব্বাইক বলেছে , সে তত বার হজ করবে । আল্লাহ তাআলা আমাদেরকেও হজ করার তাওফিক দান করুন , আমিন ! 

হজ অলঙ্ঘনীয় ফরজ বিধান :☪

-   হজ ইসলামের পঞ্চভিত্তির অন্যতম , সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর অলঙ্ঘনীয় ফরজ বিধান । এর অস্বীকারকারী কাফের , বর্জনকারী ফাসিক ।

    ( সুরা আলে ইমরান , আয়াত ৯৭ # বুখারি শরিফ , হাদিস নং ৮ )  

-হজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ :☪         

♻️    মুসলিম হওয়া ।

♻️    প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ।

♻️    সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া ।

♻️   স্বাধীন হওয়া ।

♻️   আর্থিকভাবে হজ পালনে সক্ষম হওয়া ।

♻️   হজের মাস বা সময় হওয়া ।

 যে ব্যক্তির মধ্যে উল্লিখিত সবগুলো শর্ত একসাথে পাওয়া যায় , তার ওপর হজ ফরজ হয় । 

   - হজ আদায় ওয়াজিব হওয়ার                        শর্তসমূহ :☪ 

♻️  শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা ।

♻️  কারাগারে বন্দি অথবা রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা না থাকা ।

♻️  যাতায়াতের রাস্তা নিরাপদ থাকা ।

♻️  মহিলাদের জন্য স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ সঙ্গে থাকা ।

♻️  মহিলারা ইদ্দত পালনের অবস্থায় না থাকা ।

 - যে ব্যক্তির মধ্যে হজ ওয়াজিব হওয়ার এবং হজ আদায় ওয়াজিব হওয়ার সবগুলো শর্ত একসাথে পাওয়া যায় , তার ওপর স্বয়ং হজ আদায় করা ফরজ হয়ে যায় । কিন্তু যদি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পুরোপুরি পাওয়া যায় আর আদায় ওয়াজিব হওয়ার কোনো একটি শর্তও পাওয়া না যায় , তবে তার ওপর স্বয়ং হজ আদায় করা ফরজ হয় না । এমতাবস্থায় যদি জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও হজ আদায় ওয়াজিব হওয়ার সবগুলো শর্ত একসাথে পাওয়া না যায় এবং স্বয়ং হজ আদায় করার কোনো সুযোগই না পায় , তাহলে নিজের পক্ষ থেকে অপর কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে বদলি হজ করানো অথবা হজ করানোর ওসিয়ত করে যাওয়া ওয়াজিব হয়।

         - হজের ফরজ তিনটি :☪

♻️  মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা ।

♻️  ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। 

♻️  ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্বে যেকোনো দিন পবিত্র বায়তুল্লাহ সাত বার তাওয়াফে জিয়ারত করা ।

     -  হজের ওয়াজিব ছয়টি :☪        

♻️  মুজদালিফায় অবস্থান করা ।

♻️  সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি করা ।

♻️  মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ।

♻️  মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা ( পুরুষের জন্য )।

♻️  বিদায়ি তাওয়াফ করা ( শুধু মিকাতের বাইরের হাজিদের জন্য ) ।

♻️  কুরবানি করা ( শুধু হজে কিরান ও তামাত্তু আদায়কারীদের জন্য ) ।

     -  হজের আহকামের ক্ষেত্রে নর -                নারীর পার্থক্য :☪

 নারী জাতি যেহেতু সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল ও পুরুষনির্ভর , তাই শরিয়তের বিধানাবলিতে তাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি প্রদর্শন করা হয়েছে । হজের আহকাম পালনে পুরুষ ও নারীর পার্থক্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো ।

             - পুরুষের কাজ :             

♻️  ইহরাম অবস্থায় পুরুষ তার মুখমণ্ডল , মাথা ও হাত খোলা রাখবে । কোনো প্রকার কাপড় দ্বারা আবৃত করবে না ।

♻️   পুরুষ আওয়াজ করে তালবিয়া পাঠ করবে ।

♻️   সাফা ও মারওয়া সায়ি করার সময় পুরুষ সবুজ স্তম্ভদ্বয়ের মাঝে দৌড়াবে ।

♻️   হজ সমাপনান্তে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পুরুষ মাথা মুণ্ডাবে অথবা চুল ছোট করবে ।

♻️  পুরুষ ইহরাম অবস্থায় সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করবে না ।

♻️  পুরুষগণ ভিড় হলেও যথাসম্ভব অন্যকে কষ্ট না দিয়ে হাজরে আসওয়াদের নিকট যেতে চেষ্টা করবে। 

                -  নারীর কাজ :☪   

♻️   ইহরাম অবস্থায় নারী শুধু মুখমণ্ডল খোলা রাখবে , মাথা ঢেকে রাখবে ।

♻️   নারী নীরবে তালবিয়া পাঠ করবে ।

♻️  সাফা ও মারওয়া সায়ি করার সময় নারী সবুজ স্তম্ভদ্বয়ের মাঝে স্বাভাবিকভাবে হাঁটবে ।

♻️   হজ সমাপনান্তে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নারী মাথা মুণ্ডাবে না অথবা চুল ছোট করবে না । শুধু সামান্য কিছু চুলের আগা কাটবে ।

♻️  নারীগণ প্রয়োজনে সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করবে ।

♻️  ভিড়ের মধ্যে নারীগণ হাজরে আসওয়াদের নিকট যাবে না । ভিড় এড়িয়ে চলবে ।

♻️   নারীর সাথে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ থাকা জরুরি ।

♻️  যদি হজের সময় নারীর ঋতুস্রাব দেখা দেয় , তাহলে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করেই হজের অন্যান্য কার্যাবলি যথারীতি সম্পন্ন করবে । পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ করবে । যদি কোনো নারী আরাফার ময়দানে অবস্থান ও তাওয়াফে জিয়ারতের পর ঋতুমতি হয় , তাহলে সে তাওয়াফে সদর তথা বিদায়ি তাওয়াফ থেকে অব্যাহতি লাভ করবে এবং তার হজ সম্পন্ন হয়ে যাবে ।  

-হজের মধ্যে নিষিদ্ধ কার্যাবলি  :☪   

♻️   স্ত্রীসঙ্গম করা , যৌনাচারমূলক অশ্লীল কথাবার্তা বলা ।

♻️   পাপাচারে লিপ্ত হওয়া বা গুনাহের কাজ করা । ঝগড়া - বিবাদে লিপ্ত হওয়া ।

♻️   স্থলভাগের প্রাণী শিকার করা । শিকারের প্রতি ইঙ্গিত করা । শিকারের অবস্থান নির্দেশ করা।

♻️   সুগন্ধি ব্যবহার করা ।

♻️  হাত - পায়ের নখ কাটা ।

♻️   চুল , গোঁফ ও শরীরের কোনো পশম কাটা বা উপড়ে ফেলা ।

♻️  পুরুষের জন্য সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করা ।

♻️  মাথার চুল আঁচড়ানো ।

♻️  শরীরের কোথাও তেল ব্যবহার করা ।

♻️  পুরুষের মাথা ও মুখ ঢেকে রাখা ।

♻️  টুপি বা পাগড়ি পরিধান করা ।

♻️  মহিলার মাথা খোলা রাখা ।

-হারাম টাকার হজ কবুল হয় না :☪       

 হারাম টাকায় হজ করা জায়েজ নেই । তথাপি কেউ করলে হজের ফরজ আদায় থেকে দায়মুক্তি হয়ে যায় বটে ; কিন্তু হজ কবুল না হওয়ার কারণে সাওয়াব বা আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না ।

  ( বাহরুর রায়েক , ৩/৫৪১ )

  উল্লিখিত মাসায়েল ছাড়াও হজের আরও অসংখ্য মাসায়েল রয়েছে । প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞ মুফতি সাহেবের নিকট থেকে জেনে নেয়ার অনুরোধ রইলো । আল্লাহপাক সবাইকে বোঝার এবং আমল করার তাওফিক দান করুন , আমিন !