কুরবানির পশু সম্পর্কিত মাসায়েল


        
💠শরিকে কুরবানির মাসায়েল 💠
      

🟢 উট , গরু এবং মহিষের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হয়ে কুরবানি করা বৈধ । তবে শরিক ৭ জন হওয়া জরুরি নয় । দুই , তিন , চার , পাঁচ ও ছয় জনও শরিক হয়ে কুরবানি করতে পারে । তবে প্রত্যেকেই এক সপ্তমাংশ বা তার চেয়ে বেশি অংশের মধ্যে শরিক থাকতে হবে । কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হলে কুরবানি হবে না । আর ছাগল , ভেড়া ও দুম্বা যতই বড় হোক না কেন , একাধিক ব্যক্তি তাতে শরিক হয়ে কুরবানি করতে পারবে না ।

  ( ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৭ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২০৬ )

🟢যে ব্যক্তি খালেস অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করে না , বরং গোশত খাওয়া কিংবা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কুরবানি করে , অথবা কেউ হারাম সম্পদ দ্বারা কুরবানি করে , তাহলে তার এবং সকল অংশীদারের কুরবানি নষ্ট হয়ে যায় । তাই অংশীদার নির্বাচনে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি ।

    ( বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২০৮ )

   💠 কুরবানির পশু সম্পর্কিত মাসায়েল 💠

 🟢সাধ্যানুযায়ী অধিক মূল্যের মোটাতাজা সুন্দর প্রাণী কুরবানি করা উত্তম ।

  ( রদ্দুল মুহতার , ৯/৪৬৭ )

🟢উট , গরু , মহিষ , ছাগল , ভেড়া ও দুম্বা এসব গৃহপালিত পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ । এছাড়া বন্য কোনো পশু কিংবা হাঁস - মুরগি দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নেই ।

  ( ফতোয়া কাজিখান , ৩/৩৪৮ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২০৫ )

🟢উট কমপক্ষে পাঁচ বছর , গরু - মহিষ দুই বছর এবং ছাগল , ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে । তবে হ্যাঁ , ছয়মাস বয়সের ভেড়া ও দুম্বা যদি হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার কারণে দেখতে এক বছরের মতো মনে হয় , তাহলে তা দ্বারাও কুরবানি করা জায়েজ । কিন্তু ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নেই ।

  ( ফতোয়া কাজিখান , ৩/৩৪৮ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২০৫ )

🟢কুরবানির পশুর কোনো অঙ্গের এক তৃতীয়াংশের বেশি ত্রুটিযুক্ত হলে তা দ্বারা কুরবানি করা বৈধ নয় । এর চেয়ে কম হলে তা দ্বারা কুরবানি জায়েজ হলেও অনুত্তম । তেমনিভাবে পশু যদি এমন রোগাক্রান্ত হয় যে , নিজে হেঁটে জবাইয়ের স্থানে যেতে পারে না কিংবা এমন দুর্বল হয়ে গেছে যে , হাড়ের মগজ শুকিয়ে গেছে , তাহলে এমন পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নেই ।

    ( ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৭ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২৪০ )

🟢যে পশু তিন পায়ে চলে , এক পা মাটিতে রাখতে বা ভর দিতে পারে না , এমন পশু দ্বারা কুরবানি জায়েজ নেই ।

     ( তিরমিজি শরিফ , ১/২৭৫ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২১৪ # ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৭ )

🟢যে পশুর একটি দাঁতও নেই কিংবা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে , ঘাস বা খাদ্য খেতে পারে না , এমন পশু দ্বারা কুরবানি জায়েজ নেই ।

      ( বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২১৫ # ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৮ )

🟢যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে , সে পশু দ্বারা কুরবানি জায়েজ নেই । পক্ষান্তরে অর্ধেক শিং বা কিছু অংশ ভেঙে গেলে , অথবা যে পশুর শিং ওঠেইনি , এমন পশু দ্বারা কুরবানি বৈধ ।

      ( আবু দাউদ শরিফ , ২/৩৮৮ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২১৬ # ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৭ )  

🟢যদি পশুর লেজ বা কোনো কানের এক তৃতীয়াংশের বেশি কাটা থাকে , সে পশু দ্বারা কুরবানি করা বৈধ নয় । তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় , তাহলে কুরবানি জায়েজ হবে ।

       ( ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯৭ # ফতোয়া কাজিখান , ৩/২৩৯ )     

🟢যদি পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরোই নষ্ট হয় , সে পশু দ্বারা কুরবানি বৈধ নয় ।

       ( বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২১৪ )     

🟢গর্ভবতী পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ । যদি জবাইয়ের পর পেটের বাচ্চা জীবিত বের হয় , তাহলে সেটাকেও জবাই করে দিবে । তবে প্রসবের একদম নিকটবর্তী হলে এমতাবস্থায় ওই পশু দ্বারা কুরবানি করা মাকরুহ ।

      ( ফতোয়া শামি , ৯/৪৬৭ )    

  💠কুরবানির পশু জবাই করার পদ্ধতি 💠       

🟢নিজের কুরবানির পশু নিজহাতে জবাই করা উত্তম ।

🟢 নিজে জবাই করতে না পারলে কিংবা না করলে জবাইয়ের সময় সামনে থাকা ভালো । তবে কুরবানিদাতা মহিলা হলে সামনে থাকার প্রয়োজন নেই ।

🟢প্রথমে কুরবানির পশুকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তার মুখ কিবলামুখী করবে এবং যে জবাই করবে , তার মুখও কিবলামুখী করে দাঁড়াবে । এরপর কুরবানির দোয়া পড়ে ‘ বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার ' বলে জবাই শুরু করবে ।

🟢কুরবানির দোয়া পড়া উত্তম , জরুরি নয় । তাই দোয়া না পড়ে শুধু ‘ বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার ' বলে জবাই করলেও হবে ।

      💠জবাই সংক্রান্ত মাসায়েল 💠            

🟢ঈদের নামাজের পর কুরবানি করা আবশ্যক । নামাজের আগে কুরবানি করলে সেটা কুরবানি হবে না , সাধারণ জবাই হবে ।

 ( বুখারি শরিফ , হাদিস নং ৯৬৮ # মুসলিম শরিফ , হাদিস নং ১৯৬০ )

🟢জবাইকারী ও তার ছুরিতে সহযোগী উভয় ' বিসমিল্লাহ ' বলা আবশ্যক । ইচ্ছাকৃত কোনো একজন বিসমিল্লাহ ছেড়ে দিলে কুরবানি সহিহ হবে না এবং উক্ত পশুর গোশত খাওয়া হালাল হবে না । জবাইয়ে মোট চারটি রগ কর্তন করতে হয় । 

( ১ ) শ্বাসনালি , এ রগ দিয়ে প্রাণী শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে । 

( ২ ) খাদ্যনালি , এ রগ দিয়ে খাদ্য পাকস্থলিতে পৌঁছে । 

( ৩ ) ও ( ৪ ) শাহরগদ্বয় , রক্ত চলাচলের জন্য গলার দু'পাশে এ দুটি প্রধান রগ ।

 ( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭৫ )

🟢কুরবানির পশু জবাইয়ের পূর্বে বা পরে , যার নামে কুরবানি করা হবে তার নাম বলা জরুরি নয় । এক্ষেত্রে কুরবানিদাতার নিয়তই যথেষ্ট ।

 ( ফতোয়া শামি , ৯ / ৪৭৬ # হিদায়া , ৪/৪৩৫ ) 

🟢 কুরবানির ক্ষেত্রে পশুর অতিরিক্ত কষ্ট না হয় , সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে । ছুরি ভালোভাবে ধার করে নিতে হবে । জবাইয়ের অনেক আগে হাত - পা বেধে ফেলে রাখা যাবে না । এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা উচিত নয় । পশুকে মাটিতে শোয়ানোর পর পা ধরে টেনেহেঁচড়ে জবাইয়ের স্থানে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয় । জবাইকৃত পশু মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে সম্পূর্ণ নিস্তেজ হওয়ার পূর্বে পায়ের রগ কাটা বা চামড়া খসানো কিংবা ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করা নিষেধ । 

( মুসলিম শরিফ , হাদিস নং ১৯৫৫ # আবু দাউদ শরিফ , হাদিস নং ২৮১৫ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২২৩ # ফতোয়া শামি , ৯/৪২৭ )

    💠গোশত বণ্টন সম্পর্কিত মাসায়েল 💠      

🟢যে পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে কুরবানি করে , সে পশুর গোশত ওজন করে সমানভাবে বণ্টন করা আবশ্যক । অনুমান করে বণ্টন করা জায়েজ নয় । তবে হ্যাঁ , অংশীদারগণ একান্নভুক্ত পরিবার হলে বণ্টন জরুরি নয় ।

 ( ফতোয়া শমি , ৯/৪৬০ # ফতোয়া আলমগিরি , ৫/৩০৬ )

🟢কুরবানির পশুর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রাখা , এক ভাগ প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক ভাগ গরিব - মিসকিনদের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব । তবে কুরবানিদাতা চাইলে সম্পূর্ণ গোশত নিজের জন্য রেখে দিতে পারে । বরং পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে তিন ভাগে বণ্টন না করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য গোশত রেখে দেয়া উত্তম ।

  ( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭৪ # ফতোয়া তাতারখানিয়া , ১৭/৪৩৬ ) 

🟢 কুরবানির পশুর সাতটি অংশ খাওয়া বৈধ নয় ।

১. প্রবাহিত রক্ত , 

২. লিঙ্গ , 

৩ . যোনি , 

৪. অণ্ডকোশ , 

৫. মূত্রথলি , 

৬. পিত্ত ও 

৭. মাংসগ্রন্থি । ( ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/২৯০ ) 

🟢কুরবানির পশুর চামড়া , গোশত ইত্যাদি পারিশ্রমিক হিসেবে কসাই বা অন্য কাউকে দেয়া বৈধ নয় । কসাই ও জবাইকারীকে বিনিময় হিসেবে আলাদা টাকা দিতে হবে ।

 ( ফতোয়া শামি , ৯ / ৪৭৪ # বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২৫২ )

🟢নিজের কুরবানি আদায় করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীগণ এবং মৃত আত্মীয়স্বজনের নামে কুরবানি করা বৈধ । আর এ কুরবানি তাদের পক্ষ থেকে নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে । এর ফলে তাদের কবরে কুরবানির সাওয়াব পৌঁছে যাবে । আর এ কুরবানির গোশতের বিধান স্বাভাবিক কুরবানির গোশতের মতোই । অর্থাৎ এ গোশত সকলেই খেতে পারবে ।

  ( ফতোয়া তাতারখানিয়া , ১৭ / ৭৪৪ # ইলাউস সুনান , ১৭/২৬৯ # ফতোয়া শামি , ৯/৪৭২ )

🟢 মৃত ব্যক্তি কুরবানির ওসিয়ত করে গেলে , তার পরিত্যক্ত সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানি করা জীবিতদের ওপর আবশ্যক । আর এ ওসিয়তের কুরবানির সম্পূর্ণ গোশত গরিব - মিসকিনদের সাদকা করে দেয়া ওয়াজিব ।

 ( ফতোয়া তাতারখানিয়া , ১৭/৭৪৪ # ইলাউস সুনান , ১৭/২৬৯ # ফতোয়া শামি , ৯/৪৭২ )

    💠পশুর চামড়া সম্পর্কিত মাসায়েল💠     

🟢কুরবানির পশুর চামড়া দান করা মুস্তাহাব । তবে বিক্রি করলে তার মূল্য সাদকা করা ওয়াজিব । এক্ষেত্রে মাদরাসার লিল্লাহ বোডিং - এ চামড়া বা তার মূল্য দান করলে সাদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব পাওয়া যায় । এ ছাড়া ফকির মিসকিনকে দান করা যায় ।

 ( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭৫ # ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/৩০১ ) 

🟢কুরবানিদাতা চাইলে কুরবানির পশুর চামড়া শুকিয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে নিজে ব্যবহার করতে পারে ।

 ( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭৫ )

🟢 কুরবানির চামড়ার মূল্য মসজিদ মাদরাসার নির্মাণ কাজে ও কোনো সংগঠন সংস্থায় দেয়া বা বেতন - পারিশ্রমিক বাবদ এবং অন্য কোনো কাজে খরচ করা বৈধ নয় । 

( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭৫ )

     💠কুরবানির সঙ্গে আকিকা বৈধ💠       

🟢আকিকা করা মুস্তাহাব । ছেলে বা মেয়ে জন্মের সপ্তম দিবসে তার সুন্দর ইসলামি নাম রাখা , মাথার চুল মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য কিংবা তার মূল্য সাদকা করা এবং আকিকা করা উত্তম ।

 ( তিরমিজি শরিফ , ২/২৭৮ # মিশকাতুল মাসাবিহ , ২/৩৬২ )

🟢আকিকা সন্তান জন্মের ৭ ম দিন , অথবা ১৪ তম দিন , অথবা ২১ তম দিন করা উত্তম । এরপর আর অন্য কোনো সময় নির্ধারিত নেই । মৃত্যুর পূর্বে যেকোনো সময় আকিকা করতে পারবে । 

( ইলাউস সুনান , ১৭/১১৮ # ফতোয়ায়ে রহিমিয়া , ১০/৬০ )

🟢কুরবানির মতো আকিকাও উট , গরু , মহিষ , ছাগল , ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা করা বৈধ । ছেলের ক্ষেত্রে ২ টা ছাগল আর মেয়ের ক্ষেত্রে ১ টা ছাগল অথবা উট , গরু ও মহিষের মধ্যে ছেলের জন্য দুই ভাগ আর মেয়ের জন্য এক ভাগ নিয়ে আকিকা করা মুস্তাহাব । সামর্থ্য থাকলে ছেলে - মেয়ে প্রত্যেকের জন্য উট , গরু ও মহিষ যেকোনো একটি দ্বারা আকিকা করা যায় । আর সামর্থ্য না থাকলে ছেলের ক্ষেত্রেও একটা ছাগল বা উট , গরু ও মহিষের এক অংশ দ্বারা আকিকা করা বৈধ । 

( বাদায়িউস সানায়ি , ৪/২০9 # ফতোয়া কাজিখান , ৩/২৩৭ ) 

🟢কুরবানির সঙ্গে আকিকা করা যায় । বিশুদ্ধ মতানুযায়ী উট , গরু ও মহিষের মধ্যে একজন বা একাধিক ব্যক্তি ( সর্বোচ্চ সাত নাম ) ওয়াজিব কুরবানি , দমে শুকর , আকিকা , মান্নত ও নফল কুরবানির উদ্দেশ্যে শরিক হতে পারে । এতে কুরবানির কোনো সমস্যা হয় না । যে ব্যক্তি যে নিয়ত করবে , তা আদায় হবে । 

( ফতোয়া শামি , ৯/৪৭২ # ফতোয়া তাতারখানিয়া , ১৭/৪৫২ # ফতোয়া হিন্দিয়া , ৫/৩০৫ # ফতোয়া মাহমুদিয়া , ২৬/৩২৮ )