কুরবানির ফাযায়েল ও আমল




              🔶কুরবানির গুরুত্ব🔶

কুরবানি ইসলামের একটি মহান নিদর্শন । কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা কুরবানির নির্দেশ প্রদান করে বলেন -
                          فصل
بربك وانحراف
অর্থ : তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং পশু কুরবানি করো ।
 ( সুরা কাউসার , আয়াত নং ২ )
 

হযরত আবু হুরায়রা রাযি . থেকে বর্ণিত , রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
   من کان له سعة ولم يصح فلا يقربن مولانا.
অর্থ : যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না , সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে ।
              ( ইবনু মাজাহ , হাদিস নং ৩১২৩ ) অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির নির্দেশ দিয়ে বলেন -  
 
ياايهاالناس ان على کل اهل بيت في کل عام اضحي

   

অর্থ : হে লোকসকল , প্রত্যেক ( সামর্থ্যবান ) ব্যক্তির ওপর কুরবানি দেয়া অপরিহার্য ।
       ( ইবনু মাজাহ , হাদিস নং ৩১২৫ )
       
        🔶কুরবানির ইতিহাস🔶
                  
কুরবানি আল্লাহর একটি বিধান । হযরত আদম আ . থেকে প্রত্যেক নবির যুগে কুরবানির ব্যবস্থা ছিল । আল্লাহপাক বলেন -
  ولکل امة جعلنا منسکا ليذهب کروا اسم الله على ما رزقهم من بهيمة الان عام فا لهکم اله وحد فله اسلموا وبشر المخبرين.

অর্থ : আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি , যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে । অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ , সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাকো এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও ।
        ( সুরা হজ , সুরা নং ২২ , আয়াত নং ৩৪

মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়বন্ধু হযরত ইবরাহিম আ . - কে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইবরাহিম আ . সকল পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন । আল্লাহপাক বলেন-
   وا
 جاعلك للناسذا بتلى ابر هم ربه بکلمت فااتمهن قال انى اماما قال ومن ذريته قال لا يزال اعهدى الظالمين.

অর্থ : যখন ইবরাহিমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন , অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করে দিলেন , তখন পালনকর্তা বললেন , আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করবো । তিনি ( ইবরাহিম ) বললেন , আমার বংশধর থেকেও ! তিনি ( আল্লাহ ) বললেন , আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীদের পর্যন্ত পৌছাবে না ।
    ( সুরা বাকারা , আয়াত নং ১২৪ )
     
নিজ সন্তানকে কুরবানি করার মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখিন হয়েছিলেন হযরত ইবরাহিম ( আঃ) । কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-      ইবরাহিম (আঃ)  দোয়া করলেন  হে আমার প্রভু , আমাকে এক সৎপুত্র দান করো । সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম । অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো , তখন ইবরাহিম তাকে বললো , বৎস , আমি স্বপ্নে দেখি যে , তোমাকে জবাই করছি । এখন তোমার অভিমত কী দেখো । সে বললো , পিতা , আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে , তাই করুন । আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন । যখন পিতা - পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহিম তাকে জবাই করার জন্য শায়িত করলো , তখন আমি তাকে ডেকে বললাম , হে ইবরাহিম , তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে । আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি । নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা । আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবাই করার জন্যে এক মহান জন্তু । আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে , ইবরাহিমের ওপর সালাম বর্ষিত হোক।

  (সুরা সাফফাত, আয়াত নং ১০০ থেকে ১০৯)  

হযরত ইবরাহিম আ . এবং হযরত ইসমাইল আ . - এর অতুলনীয় বিনয় , আনুগত্য ও আত্মনিবেদনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও আল্লাহর বিধানের সামনে নিজের ইচ্ছা ও খুশিকে কুরবানি করতে হবে ।
    

         🔶কুরবানির উদ্দেশ্য🔶             

কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত । এর কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে । যেমন—
🔰শর্তহীন আনুগত্য : 
আল্লাহ তাআলার যেকোনো আদেশ মানতে এবং পালন করতে আমরা বাধ্য । আল্লাহর আদেশ সহজ হোক বা কঠিন , তার প্রতি শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন করা জরুরি । আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে মায়া মমতা প্রতিবন্ধক হতে পারবে না । হযরত ইবরাহিম আ . - এর আনুগত্য ছিল শর্তহীন ।
🔰তাকওয়া অর্জন :
 তাকওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয় । পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে মানুষ তাওয়া অর্জন করতে পারে ।
🔰আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা : 
প্রত্যেক ইবাদতই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে । কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয় ।
🔰ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা : 
কুরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো , ত্যাগের মন মানসিকতা তৈরি করা । আল্লাহর বিধান পালনে জান - মালের ত্যাগ স্বীকার করা । কুরবানির ঈদকে গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয় , বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে । নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কুরবানির উদ্দেশ্য ।
🔰সামাজিক ও পারবারিক ঐক্য : 
কুরবানির মাধ্যমে সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয় । সমাজে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবধ্যভাবে কাজ করার প্রেরণা তৈরি হয় । যে গরিব মানুষরা সারা বছর একবারও গোশত খেতে পারে না , তারাও গোশত খাবার সুযোগ পায় । কুরবানির চামড়ার টাকা গরিবদের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে গরিব দুঃখী মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় । অপরদিকে কুরবানির চামড়া দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে ।

      🔶কুরবানির ফজিলত🔶
            

কুরবানির দ্বারা তাকওয়া অর্জন হয় । আল্লাহ তাআলা বলেন-
  لن ينال الله لحومها ولا دما ؤها ولكن يناله التقوى منکم
অর্থ : কুরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না । কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া ।
   ( সুরা হজ , সুরা নং ২২ , আয়াত নং ৩৭ ) 

হযরত যায়েদ বিন আকরাম রাযি . থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন , ইয়া রাসুলাল্লাহ , কুরবানি কী ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন , তোমাদের পিতা ইবরাহিম আ . - এর সুন্নাত । সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন , এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে ? তিনি বললেন , কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে । সাহাবায়ে কেরাম বললেন , ভেড়ার পশমের বিনিময়েও ? তিনি বললেন , ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি পাওয়া যাবে ।
     ( ইবনে মাজাহ , পৃষ্ঠা ২২৬ )
     
হযরত আয়েশা রাযি . থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- কুরবানির দিন বনি আদমের জন্য কুরবানির চেয়ে উত্তম ও প্রিয় কোনো আমল নেই । কিয়ামত দিবসে কুরবানির পশু শিং , পশম , খুরসহ উপস্থিত হবে । কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় ।
তাই তোমরা খুব আনন্দচিত্তে কুরবানি করো । ( তিরমিজি শরিফ , ১/২৭৫ )।