মিসওয়াক সম্পর্কে বিজ্ঞান কি বলে?



 মিসওয়াক সম্পর্কে বিজ্ঞান কি বলে? 


রাসূল সাঃ এর প্রত্যেকটি কথা ও কাজের মধ্যে মানব জাতির জন্য অসংখ্য কল্যাণ ও হেকমত নিহিত রয়েছে এবং তার কথা মানার মধ্যে রয়েছে । পরকালীন সাফল্য । কারণ , তিনি হলেন মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ । এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে এরশাদ হচ্ছে

 لقد كان لكم في رسول الله اسوة حسنة لمن كان ير جوا الله واليوم الآخر وذكر الله كثيرا . “

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে , তাদের জন্য রাসূল এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে । 

অন্য আয়াতে কারিমায় এরশাদ হচ্ছে

 ما اتاكم الرسول فخذوه وما نهاكم عنه فانتهوا

রাসূল সাঃ তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন , তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেছেন , তা হতে বিরত থাক । 

রাসূল সাঃ এর সুন্নত আমল সমূহের মধ্যে মিসওয়াক একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকেও মেসওয়াকের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে । নিম্নে সুন্নত ও বিজ্ঞানের আলোকে মিসওয়কের গুরুত্ব তুলে ধরা হলঃ 

মিসওয়াক কি ?: مسواكশব্দটি السواك হতে উৎপন্ন এর  শাব্দিক অর্থ হল দাঁতন। 

ইসলামি শরিয়াতের পরিভাষায় , আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্য দাঁত ও তার চতুর্দিক ডাল বা অন্য কিছু দিয়ে পরিষ্কার করাকে |مسواك বলে 

মিসওয়াক এর পরিচয় সম্পর্কে المعجم الوسيط প্রণেতা বলেন ,عوديتخذمن شجر الاراك ونحوه يستاك به 

মিসওয়াক হলো এমন কাঠ যা আরাক বা এর অনুরূপ গাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে । ' মিসওয়াকের ধরণঃ 

মিসওয়াক সরল ও যতটুকু পরিমাণ দ্বারা দন্ত ঘর্ষণ করতে হবে সেই পর্যন্ত নরম ও গিরাহীন হওয়া মুস্তাহাব ( হাশিয়ায়ে তাহতাবী ) 

তিক্ত জাতীয় গাছের ডাল দ্বারা মিসওয়াক করা মুস্তাহাব । যথা নিম , পিককরা , ভাইট প্রভৃতি । যে ব্যক্তি মিসওয়াক করবে তার হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলীর ন্যায় মোটা হওয়া ও এক বিঘত পরিমাণ লম্বা হওয়া মুস্তাহাব । শামী কিতাবে লিখিত আছে যে , প্রথমবার এক বিঘত পরিমাণ মিসওয়াক হওয়া মুস্তাহাব । ব্যবহার করতে করতে খাটো হলে সমস্যা নাই । 

হাদিস শরীফের আলোকে মিসওয়াকঃ 

বিশ্ব মানবতার পথ প্রদর্শক রাসূলে আরাবী সাঃ মিসওয়াকের ফযিলত সম্পর্কে অনেক বাণী রেখে গিয়েছেন । তার কতিপয় নিম্নে আলোকপাত করা হলো।

 عن ابي هريرة ( رضي ) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لولا ان اشق على امتي لا مرتهم بتأخير العشاء وبا السواك عند كل صلوة ( متفق।

" হযরত আবু হুরায়রা ( রা . ) হতে বর্ণিত , তিনি বলেন , রাসূল সাঃ বলেছেন , আমি যদি আমার উম্মতের কষ্ট হবে না মনে করতাম , তাহলে ইশার নামাজ দেরি করে পড়তে আর প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করতে হুকুম করতাম । ( বুখারী ও মুসলীম )

হযরত আয়েশা ( রা . ) হতে বর্ণিত , রাসূল সাঃ বলেছেন 

السواك مطهرة للفم ومرضاة للرب ( بخاری 

মিসওয়াক করলে যেমন মুখ পবিত্র , পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধ মুক্ত হয় তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টিও হয় । " ( বুখারী শরীফ ) 

রাসূলটি অন্যত্র এরশাদ করেন

 ماجاء جبرئيل عليه السلام قط الا امرنی با السواك لقد خشيت ان تمعنی ( مقدم قمحی ) “

এমনটি কখনও হয়নি যে জিবরাঈল ( আ . ) আমার নিকট এসেছেন আর আমাকে মিসওয়াকের পরামর্শ দেননি । এতে আমার আশংকা হচ্ছিল যে , মিসওয়াক করতে করতে মুখের অগ্রভাগ ছিলে না ফেলি । 

রাসূল ( সা . ) এর বাণীঃ

 فضل الصلاة التي يستاك لها على الصلاة التي لا يستاك لها سبعين ضعفا .

মিসওয়াক করে যে নামাজ আদায় করা হয় সে নামাজে মিসওয়াকহীন নামাজের তুলনায় সত্তুর গুণ বেশি সওয়াব রয়েছে । 

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মিসওয়াকঃ 

মিসওয়াক সম্পর্কে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তার পাণ্ডিত্ব সুলভ উক্তি এ ভাবে করেছেন যে , যেদিন হতে আমরা মিসওয়াক ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি সেদিন হতে“ ডেন্টাল সার্জন Dental surgeon এর সুত্রপাত হয়েছে । 

এবার আসুন ! আমরা একটু পরীক্ষা করে দেখি নবি করীম এর সুন্নাত মানুষের স্বভাব সুলভ কিনা ? এই সুন্নাত আমাদের পাথরের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায় , না বিজ্ঞানের নিকটবর্তী করে দেয় । 

নামাযের পূর্বে মিসওয়াকঃ 

প্রকৃত পক্ষে নামায যেহেতু আল্লাহ তায়ালার গুণকীর্তন করা তাই নামাযের পূর্বে মুখ পরিষ্কার করা অত্যাবশ্যক । যদি নামাযের পূর্বে মিসওয়াক না করা হয় তাহলে দাতের ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ গুলো জিহ্বায় লেগে নামাযের একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটায় । আর মিসওয়াক করার সময় মুখ এমন ভাবে ( Roy ) হিল্লোলিত হয় যা দ্বারা ইবাদতে পাওয়া যায় অনাবিল শান্তি । 

সুইজারল্যান্ডের জনৈক ডাক্তার ও মিসওয়াক সুইজারল্যাণ্ডের জনৈক ডাক্তার তার জীবনের একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন যে , একদা আমার দাঁত ও মাড়িতে এমন কঠিন রোগের সৃষ্টি হয়েছিল যার চিকিৎসা তদানিন্তন ডাক্তারের নিকট দুরূহ ব্যাপার । অগত্যা আমি মিসওয়াক ব্যবহার শুরু করলাম । সত্যিই অবাক ব্যাপার কিছু দিনের মধ্যেই আমার দাঁত সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেল । পরবর্তীতে মিসওয়াকের উপর রিচার্চ করা শুরু করে দিলাম । 

ব্রাশ ও মিসওয়াকের মধ্যে পার্থক্য : 

যদি প্রশ্ন করা হয় যে , দাতের পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষার জন্য ব্রাশ বেশি প্রয়োজনীয় না মিসওয়াক ? এ বিষয় সম্পর্কে এখানে আলোচনা করব । 

ব্রাশ : 

জীবাণু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণের দীর্ঘ দিনের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ কথা চুড়ান্ত রূপ লাভ করেছে যে , একবার ব্যবহার করা ব্রাশ স্বাস্থের জন্য তখনই ক্ষতিকর যখন উহা দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় । কেননা , ব্যবহারের দ্বারা জীবাণুর ভিত্তি স্থাপিত হয় । পানি দ্বারা পরিষ্কার করলেও তা থাকে ক্রমবর্ধমান ।তাছাড়া ব্রাশ দাঁতের উপড়ের স্তরকে দূর করে দেয় । ফলে দাঁতের মধ্যে ফাঁকা সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে দাঁত মাড়ির হতে বিচ্যুত হতে থাকে । 

মিসওয়াক : 

এমন বৃক্ষের মিসওয়াক দাতের জন্য উপযোগী যার আঁশগুলে নরম , যা দাতের মধ্যে ফাঁকা সৃষ্টি করে না এবং মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি করে না । নিম্নে এর উপকারিতা তুলে ধরা হলো। 

হৃৎপিন্ডের ঝিল্লিতে পুঁজ ও মিসওয়াক : 

হেকিম এস . এম ইকবাল " জাহান " নামক পত্রিকায় লিখেন যে , আমার কাছে এক রোগী এসেছিল , যাঁর হৃৎপিণ্ডের ঝিল্লিতে পুঁজ জমা হয়েছিল । এর জন্য লোকটি চিকিৎসাও নিচ্ছিল কিন্তু কোনো ফল হচ্ছিল না । অবশেষে আমি পরীক্ষা করে দেখলাম যে , তার দাতের মাড়িতে ক্ষত আছে । তাতে রয়েছে পুঁচ ভর্তি । তার দাঁতের মাড়ির পুঁজই হৃৎপিণ্ডে জমা হচ্ছে । প্রথমে তার দাঁত ও মাড়ির জন্য চিকিৎসা করা হলো । সেবনের জন্য কিছু ঔষধ ও ব্যবহারের জন্য মেসওয়াক দেওয়া হলো ফলে অতিদ্রুত তার রোগ নিরাময় হল । 

মস্তিষ্ক ও মিসওয়াক : 

হযরত আলি ( রা . ) বলেন , মিসওয়াক দ্বারা মস্তিষ্ক সতেজ হয় । প্রকৃত পক্ষে মিসওয়াকের মধ্যে থাকে ফসফরাস জাতীয় পদার্থ । রিসার্চ ও অনুসন্ধানের আলোকে এ কথা স্বীকৃত যে , যেই জমিতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস অধিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে সেখানে পীলু বৃক্ষ বেশি জন্মে । আর দাঁতের প্রধান খাদ্যই ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস । পীলু বৃক্ষের মেসওয়াক নরম অবস্থায় চাবালে তার মধ্য হতে বেরিয়ে আসে তিক্ত ও তেজস্ক্রিয় এক প্রকার পদার্থ । এ পদার্থ দাঁতকে রোগ মুক্ত ও মস্তিষ্ক সতেজ রাখে । 

গলা ও মিসওয়াক : 

টনসিলের ( Tonsils ) রোগীদেরকে মিসওয়াক ব্যবহার করিয়ে যথেষ্ট ফল পাওয়া গেছে । এক ব্যক্তির গলার মাংস গ্রন্থি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে খুব পেরেশান ছিল । তাকে তুত ফলের শরবত ও মিসওয়াক করতে দেওয়া হলো । এ চিকিৎসা অবলম্বন করার পর রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করল।

সর্দি , কাশি ও মিসওয়াক : 

স্থায়ী সর্দি - কাশির রোগীর শ্লেষ্মা যদি জমাট বেধে থাকে সে ক্ষেত্রে মিসওয়াক ব্যবহার করলে শ্লেষ্মা ভিতর থেকে বের হয়ে মস্তিস্ক হালকা হয়ে যায় । একজন প্যাথলজিষ্ট ( Pathologist ) বলেছেন যে , পরীক্ষা নিরীক্ষা আমাকে একথা বলে দেয় যে , মিসওয়াক হলো সর্দি কাশির সর্বোচ্চ প্রতিরোধক । উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা একথা স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারি যে , মিসওয়াকের গুরুত্ব শুধু হাদিসেই দেওয়া হয়নি বরং বিজ্ঞানেও এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে । তাইতো “ গুরু নানক ” বলেছেন “ হয়ত এই লাকড়ি গ্রহণ কর , নতুবা রোগকে বরণ কর ” । আল্লাহ আমাদের সকলকে রাসূল এর এই সুন্নাতকে আকড়ে ধরার তাওফিক দিন । আমিন ।