"মদ , জুয়া ও লটারীর কুফল"

 


মদ , জুয়া ও লটারীর কুফল

অবতারণিকা : 

          মদ , জুয়া ও লটারী সামাজিক অনাচার এবং মারাত্মক অপরাধ । মানুষকে অনিয়ম ও অনৈতিক কাজ করার জন্য যে সমস্ত জিনিস উদ্বুব্ধ এবং উৎসাহিত করে , সমাজকে করে ক্ষত বিক্ষত , যুব সমাজ হয় বিপথগামী , তারই অপর নাম মদ - জুয়া ও লটারী । এই তিনটি কর্মকে আল কুরআনে অশ্লীল ও শয়তানের কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে । 

মদঃ 

         মদ হলো পানীয় নেশাজাত তরল পদার্থ । মদের মধ্যে রয়েছে নেশা জাতীয় পদার্থ অ্যালকোহল । যা পানকারীকে নেশাগ্রস্থ করে । এ নেশাজাতীয় পদার্থ যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন মানুষ মাতাল অবস্থায় পৌঁছে । শিক্ষিত , অশিক্ষিত , উচ্চ ও নিম্ন ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ মদ পান করে থাকে । তারা বলে মদে অনেক উপকার আছে । আসলে মদ কোনো উপকার নেই । যেমন এক ধরণের মদ আছে যার ভিতর তামাক পাতার নির্যাস দেওয়া হয় । তামাকে নিকটিন নামক এক প্রকার এনজাইম আছে । নিকটিন মানুষের দেহে ক্যান্সার রোগ ছড়ায় । নিকটিন ক্যান্সার জীবানু সৃষ্টি করে । হুক্কা , বিড়ি , তামাক , গাজার মত নেশা জাতীয় পদার্থ মানুষ গ্রহণ করে । এ ধরনের ধুম পান জাতীয় নেশা দ্রব্য মানুষের ফুস ফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে । ধুম পান যক্ষ্মা রোগ সৃষ্টি করে । ধুমপান কারী কোন রোগে আক্রান্ত হলে তা সহজে মুক্ত হয় না । কারণ ঔষধের শক্তিকে ঐ ধুমপানের বিষ নষ্ট করে দেয় । মেডিকেল সাইন্স ধুম পানকে বিষ পানের সাথে তুলনা করেছে ।

নেশাজাতীয় পদার্থের কুফল : 

         পূর্বে বলা হয়েছে নেশাজাতীয় পদার্থ কে বিষের সাথে তুলনা করা হয়েছে । বিষ পান করলে যেমন মানুষ মারা যায় । তেমনই নেশা জাতীয় পদার্থ গ্রহন করলে সাথে সাথে মানুষে বিষে আক্রান্ত হয় । প্রথমে মানুষ চিত্ত - বিনোদনের জন্য নেশাজাত দ্রব্য গ্রহণ করে । তা গ্রহণে অন্তরকে আনন্দ দেয় । বন্ধুদের মাধ্যমে গ্রহণ করে , আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে গ্রহণ করে । এভাবে বেশ কিছু দিন চলতে থাকে ; পরিশেষে এমন এক পর্যায় পৌঁছে তখন ঐ দ্রব্য গ্রহণ করতে মনে ইচ্ছা জাগে । 

            এভাবে ইচ্ছা করতে করতে একসময় মোটা মুটি ভাবে নেশায় পরিণত হয় । এ অবস্থাও বেশ কিছু দিন চলতে থাকে । পরিশেষে তা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত হয় । সময়ের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এর অর্থ হলো যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা গ্রহণ করা হয় এ অবস্থাকে মারাত্মক অবস্থা বলে । যেমন কারো অবস্থা এমন হয় যে সে সপ্তাহের শনিবার মদ পান বা গাজা , আফিন অথবা হিরোইন নামক দ্রব্য পান করছে পরের সপ্তাহের শনিবার এ জাতীয় দ্রব্য পান করতেই হবে তানাহলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে বা মারা যাওয়ার আশংকা আছে এ অবস্থাকে নেশার মারাত্মক অবস্থা বলে । 

নেশার তীব্রতা সৃষ্টি হওয়ার পরে নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করলে সে মাতাল হয়ে যায় । পরিশেষে লোকটির হিতাহিত জ্ঞান থাকে না । আমাদের দেশের যুবক সমাজ বেশির ভাগ এহেন অপৃতিকর কাজে জড়িত বেশি । স্কুল , কলেজ , ইউনিভার্সিটির এবং অশিক্ষিত কিছু যুবক এই নেশার বেড়াজালে আবদ্ধ । সমাজকে বাঁচাতে হলে মদকে না বলতে হবে । নেশা গ্রন্থ সন্তান দ্বারা পিতামাতা এমনকি সমাজ হতাশা গ্রন্থ । চুরি , ডাকাতি , হাইজাক , লুণ্ঠন , ব্যভিচারি এ রকম অপৃতিকর ঘটনা নেশার কারণে ঘটে থাকে । 

           যখন নেশাখোর নেশায় আক্রান্ত হয় তখন নেশা দ্রব্য সংগ্রহণ করার জন্য অর্থের খোজে নেমে যায় । পরিশেষে একজন ভাল মানুষ চোর ডাকাত , লুণ্ঠকারীতে পরিণত হয় । তা বলা যেতে পারে ব্যক্তি ভাল হলে সমাজ ভাল হবে , সমাজ ভাল হলে দেশ ভাল হবে । মদ পানকারী দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতি গ্রন্থ হবে । মদ পানকারী সম্পর্কে রাসূলে পাক ( সা . ) ইরশাদ করেন 

 عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما : أن رسول الله صلى الله علیه و سلم قال ( من شرب الخمر في الدنياثم لم يتب منها حرمها في الآخرة . 

অনুবাদ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ( রা . ) হতে বর্ণিত । রাসূল ( সা . ) বলেছেন , যে লোক দুনিয়ায় মদ পান করল ; অতঃপর তা থেকে তাওবা করল না , সে আখিরাতে তা থেকে বঞ্চিত হবে ( জান্নাত থেকে ) ( বুখারী শরীফ ৭ তম খণ্ড , হাদীস নং ৫৫৭৫ )

          বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় মদ পান করা তাদের জন্য একটি সামাজিক সভ্যতা । একথা মুখে উচ্চারণ করলে নাউযুবিল্লাহ বলতে হয় । কারণ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূ (সা .) মদকে হারাম ঘোষণা করেছেন । আমাদের দেশেও যাতে সামাজিক সভ্যতায় পরিণত না হয় সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে । নেশা দ্রব্য সেবন করা কে আল কুরআন শয়তানের আমল বলে ঘোষণা করেছে । মদসহ সকল ধরণের নেশা জাতীয় দ্রব্য বন্ধ করার কয়েকটি উপায় নিম্নে তুলে ধরা হল 

( ১ ) মদ ও নেশা জাতীয় পদার্থের কুফল সম্পর্কে মানুষকে অবগত করানো । 

( ২ ) খবরের পেপারসহ সকল ধরণের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে । 

( ৩ ) ইসলামের মূল্যবোধ মানুষের অন্তরে জাগ্রত করে  

( ৪ ) ওয়াজ মাহফিলে মদের কুফল সম্পর্কে আলোচনা করে । 

( ৫ ) জুমার দিন মসজিদে বিশেষ তা'লিমের মাধ্যমে । পোষ্টার ও দেয়ালিং করে । 

( ৭ ) বিভিন্ন সেমিনারে আলোচনা করে । 

( ৮ ) ডাক্তারি যুক্তি পরামর্শে , পোষ্টারের চিত্র অংকন করে রাস্তার মোড়ে ও স্টেশনে লটকানোর মাধ্যমে । ( ৯ ) মিডিয়া ও খবরের মাধ্যমে প্রচার করে । 

( ১০ ) ফরজ ও সুন্নতের আ'মল শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে । 

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মদ ও জুয়া সম্পর্কে আল কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করেছেন 

يسألونك عن الخمر والميسر قال فيهما إثم كبير ومنافع يناس وإنها أكبر من نفعهما .

 অনুবাদ : তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে । বল , এ দুটোর মধ্যে রয়েছে বড় পাপ ও মানুষের জন্য উপকার । আর তার পাপ তার উপকারিতার চেয়ে অধিক বড় । 

( সূরা বাক্কারা , আয়াত নং ২১৯ )

জুয়া খেলার মাধ্যমে কিছু সংখ্যক মানুষ সাময়িকভাবে উপকৃত হয় । আমাদের দেশে বিভিন্ন রকমের জুয়া খেলা রয়েছে । যেমন- তাস দিয়ে খেলা , কোটে চিত্র অংক করে খেলা , চরকা ঘুড়িয়ে খেলা । এ খেলায় টাকা বা বিভিন্ন মালামাল ধরা হয় , চার পাঁচ জন বা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক লোক ঐ খেলায় অংশ গ্রহণ করে । যারা অংশ গ্রহণ করে তাদের মধ্যে একজন ভাগ্যবান হয় বাকিরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় । এ খেলায় অনেক সময় অপৃতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যায় । এমনকি মানুষ জীবন ও হারায় । এজন্য ক্ষতির দিকটা বেশি হয় । 

ক্ষতির বিভিন্ন বিষয় নিম্নে তুলে ধরা হলো :

( ১ ) ভ্রাতৃত্ব বোধ নষ্ট হয় । 

( ২ ) শয়তানের অনুসরণ করা হয় । 

( ৩ )সময় অপচয় হয় এবং মানুষের মধ্যে অলসতা এসে যায় । 

( 8 ) অর্থ সম্পদ হ্রাস পায় । 

( ৫ ) সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় ।

( ৬ ) পাপ কাজে লিপ্ত হয় । ক্বলবে কুরিপু প্রবেশ করে ।

( ৭ ) নেক আমল থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে ।

( ৮ ) নামাজ থেকে বিরত রাখে । 

( ৯ ) আস্তে আস্তে দারিদ্রতা আসতে থাকে । 

( ১০ ) শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে । মদ , জুয়া ও লটারী শয়তানের কাজ । এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন

 يا أيها الذين آمنوا إنما الخمر والميسر والأنصاب - والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه - لعلكم تفلحون .

অনুবাদ : হে মুমিনগণ! নিশ্চয়  মদ জুয়া প্রতিমা বেদী ও ভাগ্য নির্ধারক তীর সমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম । সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর , যাতে তোমরা সফলকাম হও । ( সূরা মায়িদা , আয়াত নং ৯০ ) 

শয়তান মানুষদেরকে মদ ও জুয়ার প্রতি আহ্বান করে । এ সম্পর্কে আল কুরআনুল কারীমে ইরশাদ।

 إنما يريد الشيطان أن يوقع بينكم العداوة والبغضاء في الخمر والميسر ويصدكم عن ذكر الله وعن الصلاة فهل أنتم منتهون . 

অনুবাদ : শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায় । আর আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে । অতএব , তোমরা কি বিরত হবে ? (সূরা মায়িদা, আয়াত নং ৯১) 

মদের আধিক্য পাওয়া কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে রাসূলে পাক ( সা . ) ইরশাদ করেন 

عن أنس بن مالك قال ألا أحدثكم حديثا شيعته من رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يحدثكم أخد بعدى سبعة منه إن من أشراط الساعة أن يرفع العلم ويظهر الجهل ويفشو الزنا ويشرب الخير ويلقب الرجال وتبقى النساء حتى يكون لحسين امرأة قيم واجد ۔

অনুবাদ : হযরত আনাস ইবনে মালিক ( রা . ) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন , আমি কি তোমাদের কাছে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করব , যা আমি রাসূল ( সা . ) কে বলতে শুনেছি এবং আমার পরে কেউ তা তোমাদের কাছে বর্ণনা করবে না । আমি তাঁর কাছে শুনেছি যে , কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্যতম হচ্ছে ইলম উঠে যাবে , মুর্খতা প্রকাশ পাবে , যিনা বিস্তৃত হবে , মদ্যপান চলতে থাকবে , পুরুষরা চলে । যাবে আর নারীরা অবশিষ্ট থাকবে , এমনকি পঞ্চশজন নারীর জন্য একজন পুরুষ তত্ত্বাবধায়ক থাকবে । ( মুসলিম শরীফ ৪ র্থ খণ্ড , হাদীস নং ২৬৭১ ) 

মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ ব্যক্তির ওপরে লা'নত সম্পর্কে রাসূকে পাক ( সা . ) ইরশাদ করেন :

 عن أنس بن مالك قال لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم في الخمر عشرة . عاصرها . ومعتصرها وشاربها وحاملها والمحمولة إليه وساقيها وبائعها وأكل ثمنها والمشترى لها والمشتراة له .

অনুবাদ : হযরত আনাস ইবনে মালিক ( রা . ) হতে বর্ণিত , হযরত রাসূল ( সা . ) মদের সাথে সম্পর্কিত দশ শ্রেণির লোকদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন , তারা হলো 

(১) মদ প্রস্তুতকারী । 

(২) মদ প্রস্তুতের পরামর্শদাতা । যেসব পদার্থ দিয়ে মদ তৈরি হয় তার প্রশিক্ষণ দাতাগণ । মদ পানকারী । ঐ সমস্ত নেশা গ্রন্থ ব্যক্তি বর্গ যারা মদ পান করে । 

(8) মদ বহনকারী । নিজে পদ পান করে না কিন্তু বাহক হিসেবে অন্যের কাছে পৌঁছে দেয় । 

(৫) যার নিকট মদ বহন করা হয় । অর্থাৎ মদ বহনকারী মদ কারখানায় এনে কারো কাছে জমা রাখল ঐ জমাকারীও অপরাধি ।

(৬) মদ পরিবেশনকারী । মদ পরিবেশনকারী মদ পান করুক বা নাই করুক সে অপরাধী বলে গন্য হবে 

(৭) মদ বিক্রেতা । মদ বিক্রেতা মদ পান না করলেও অপরাধী হবে । আর পান করলে তো সে জগন্য অপরাধ করল । 

(৮) যে মদের মূল্য গ্রহণ করে । অর্থাৎ মদ বিক্রয় কেন্দ্রে কর্মচারী হিসেবে থাকে সে ব্যক্তিও অপরাধি হবে । 

(৯) মদ ক্রয় - বিক্রয়কারী । 

(১০) যার জন্য মদ ক্রয় করা হয় । 

( সূত্র : তিরমিযী তখণ্ড , হাদীস নং ১২৯৫ )

 

লটারী :

      লটারী ধরার মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করা আল কুরআনুল কারীমে হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে । সমাজে বিভিন্ন লটারী বের হয়েছে । বিশেষকরে খেলা ড্র হওয়ার লটারী । এ ধরণের লটারীতে যে ব্যক্তি সঠিক নম্বরের লটারী ধরতে পারবে তাকে মোটা অংকের টাকা অথবা আকর্ষনীয় মালামাল দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে । এহনে কাজ ইসলাম হারাম করে দিয়েছে । অনেক সময় যাত্রা , পিকনিক , বিয়ের অনুষ্ঠানে , লটারী বিতরণের আয়োজন করা হয় । যা একজন মুসলমানের জন্য জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ । মুসলমান সন্তানের বিয়ে পড়ানোর সময় আল কুরআনের আয়াত ও আল হাদীস পাঠ করে খুৎবা দেওয়া হয় । নবীজীর কালিমা পাঠ করে বিবাহ বন্ধন করা হয় । অথচ সেখানে শয়তানের কর্মকাণ্ড মূলক আচরণও করা হয় । সকলকে মনে রাখা উচিৎ আমরা মুসলমান , সকল নবী - রাসূলগণ প্রতিমা পুজা ও লটারীর বিরুদ্ধে কাজ করে গিয়েছেন । আমরাও যাতে সেই আদর্শে থাকতে পারি । আল্লাহ কবুল করেন । আমিন !